গুলশান-বনানীর অর্ধেকের বেশি ভবনে নেই সেপটিক ট্যাংক, এক মাসের সময় পাচ্ছেন মালিকরা

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীর অর্ধেকের বেশি ভবনে নেই সেপটিক ট্যাংক। এসব ভবনের বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে লেক ও খালে। এতে করে গুলশান-বনানী লেকের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী এক মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট ভবনগুলোতে সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
গুলশান-বনানী এলাকায় মোট ভবন রয়েছে ৪ হাজার ৪০৯টি। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫৪০টি ভবনে সচল সেপটিক ট্যাংক আছে। ১ হাজার ৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। ১ হাজার ৪৭টি ভবনের স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি ওয়াসার লাইনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য প্রতিদিন লেক, খাল কিংবা ওয়াসার লাইনে গিয়ে মিশছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চালানো রাজউকের সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকেতন এলাকার ভবনগুলোতে রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক ও সোক পিট আছে কি না, তা যাচাই করতে এই জরিপ চালানো হয়। প্রতিবেদনের আলোকে সোমবার (৬ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে এসটিপি (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ও সুয়ারেজ লাইন আধুনিকায়নের খসড়া প্রস্তাবনা তোলা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়নে চূড়ান্ত রোডম্যাপ ঘোষণা করবে ঢাকা ওয়াসা ও রাজউক।
অর্ধেকের বেশি ভবনে নেই সেপটিক ট্যাংক
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজউক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন স্তরের একটি সুপারিশমালা চূড়ান্ত করেছে। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগে যেসব ভবনের নকশায় সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল অনুমোদিত আছে, তাদের আগামী এক মাসের মধ্যে তা কার্যকর করতে হবে। ইতোমধ্যে অনেক ভবন মালিক এই কাজ শুরু করেছেন এবং কেউ কেউ সময় বৃদ্ধির আবেদন জানালে সর্বোচ্চ দুই মাস পর্যন্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বনানী এলাকায় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জোনাল এসটিপি বা পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করা হবে, যেখানে স্থানীয় সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন নিয়মে ৫ কাঠার ওপরে যে কোনো ভবনের ক্ষেত্রে নিজস্ব এসটিপি নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে। এর অধীনে গুলশান, বনানী ও নিকেতন এলাকার সমস্ত সুয়ারেজ লাইনকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় এনে সরাসরি দাশেরকান্দির মূল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে স্থানান্তর করা হবে।
ঝুঁকিতে ঢাকার মাটি, সোক ওয়েল নিয়ে নতুন জটিলতা
রাজউকের ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন বা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে দেখা গেছে, ঢাকার মাটির নিচে কাদার পরিমাণ বেশি হওয়ায় অনেক জায়গায় সোক ওয়েল ঠিকমতো কাজ করছে না এবং পানি উপচে পড়ছে। এই জটিলতা নিরসনে দ্রুতই বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে গত ২০ মে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার বিদ্যমান ভবনসমূহের পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ লাইন যাচাইকরণে ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), গুলশান সোসাইটিসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাজউকের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ শাখার অধীনে ১০টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়ে। এতে দ্রুততার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করতে অন্যান্য জোন থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী অথরাইজড অফিসার, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শকদের এই কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। গঠিত কমিটিকে গত ২৫ জুন রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়।
এদিকে, ২১ মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে আরেক সভায় গুলশান লেক উন্নয়ন সংক্রান্ত বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তসমূহের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় জানানো হয়, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার ভবনগুলোর সুয়ারেজ লাইন থেকে লেকে সরাসরি সংযোগ প্রদান করা হয়েছে কিনা, তা চিহ্নিত করতে রাজউকের সদস্যকে (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে রাজউক ছাড়াও ডিএনসিসি, ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকেতন সো সোসাইটিসমূহ এবং জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব এলাকার ভবনসমূহে রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক ও সোক পিট আছে কি না তা যাচাই করতে এক মাসের বিশেষ জরিপ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনের অবৈধ পয়ঃসংযোগ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ সময় মন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এক মাসের মধ্যে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার সকল ভবনের জরিপ সম্পন্ন করে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে হবে। জরিপ চলাকালীন যেসব বিল্ডিংয়ে নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক ও সোক পিট পাওয়া যাবে না, সেগুলোর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট বা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে অবৈধ পয়োসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। রাজউকের নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করা হলে সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকসহ দায়িত্বরত সকলের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য রাজউকের সঙ্গে ডিএনসিসি, ঢাকা ওয়াসা ও স্থানীয় সোসাইটিসমূহের দ্রুত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হবে।
এছাড়া রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মার্ণের বিষয়টি রাজউক সঠিকভাবে তদারকি করছে কিনা তা মনিটরিং করতে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা-১)-কে নিশ্চিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং টিমও গঠন করা হবে বলে জানানো হয়।
তবে গত ২১ জুন রাজউকের প্রধান নগর স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ নিজেকে আপিল কমিটির সদস্য সচিব দাবি করে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ২৯-এর উপ-বিধি (১)(খ) এবং বিধি ৩১-এর উপ-বিধি (১)(খ) অনুযায়ী রাজউক চেয়ারম্যানকে সভাপতি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা-১)-কে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি আপিল কমিটি গঠন করেন। রাজউকের প্রধান নগর স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) ও আপিল কমিটির সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ স্বাক্ষরিত এই আদেশে বলা হয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এই আদেশ জারি করা হলো এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এদিকে রাজউকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে রাজউকের আপিল কমিটি গঠনের অফিস আদেশ উন্নয়ণ নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসন বিভাগ থেকে হওয়ার কথা। তবে এই কর্মকর্তা নিজেকে হাজির করতে নিজেকে আপিল কমিটির সদস্য সচিব হিসাবে দেখিয়ে কমিটি গঠনের আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।’
এই বিষয়ে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক-১) মো. মনিরুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গঠিত কমিটি ভৌত অনুসন্ধান ও মাঠপর্যায়ের জরিপের আলোকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই সংক্রান্ত বৈঠক হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনার পরে সরকার প্রধানের নির্দেশনার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’






