অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ/ভালো পদের লোভে টাকা দিয়ে জুটছে গার্ডের চাকরি

অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে চাকরিপ্রত্যাশী যুবকদের নিঃস্ব করছে এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। কাঙ্ক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। আর টাকা খোয়ানোর পর মিলছে না কাঙ্ক্ষিত চাকরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি। এমনকি প্রতারণার শিকার হয়ে পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার। ফলে চরম হতাশায় ভুগছেন বরিশালের চাকরিপ্রত্যাশী তরুণরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান যুগে অনলাইনে চাকরির আবেদন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে মাকড়সার জালের মতো ফাঁদ পেতেছে প্রতারকরা। এতে তরুণদের পকেটের টাকা যেমন যাচ্ছে, তেমনই তাদের ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে অপরাধীদের হাতে; যা পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের বড়ো হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিমানবন্দর নাকি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি
ভোলার আব্দুল জব্বার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জিসান। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে অনলাইনে একটি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখেন— ‘হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়োগ চলছে’। বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে যোগাযোগ করলে তাকে রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের একটি ভবনে ডাকা হয়। সেখানে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বিমানবন্দরের ভেতরে চাকরি দেওয়ার নামে জিসানের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর তাকে বিমানবন্দরের বদলে একটি বেসরকারি কোম্পানির সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি ধরিয়ে দেওয়া হয়। ২৫ দিন সেই ডিউটি করার পর জিসান যখন মূল চাকরির ব্যাপারে জানতে চান, তখন তাকে হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রতারণার শিকার জিসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে অনেক আশা নিয়ে ঢাকা গিয়েছিলাম। জমানো টাকা আর বাবার থেকে নেওয়া ১২ হাজার টাকা ওদের হাতে তুলে দিই। আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধুও গিয়েছিল। কাঙ্ক্ষিত চাকরির কথা বলায় আমাকে হুমকি দেওয়া হয় আর আমার বন্ধুকে মারধর করা হয়। উত্তরায় পুলিশের কাছে গেলেও তারা কোনো সহায়তা করেনি। এমনকি যে ২৫ দিন সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করলাম, সেই বেতনটাও দেয়নি।’
এনজিওর নামে ফাঁদ, টাকা খুইয়ে বিপাকে আরেক যুবক
একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষার্থী সানবির মাহমুদ। ফেসবুকে একটি ভুয়া এনজিওর চটকদার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেছিলেন তিনি। এশিয়া পোস্টকে সানবির জানান, ‘বিজ্ঞপ্তিটি এত নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল যে বোঝার উপায় ছিল না এটি প্রতারণা। আবেদনের পর পরীক্ষা ও ফি বাবদ বিকাশের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা দিই এবং আমার সব ব্যক্তিগত তথ্য জমা দিই। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হলেও তারা যোগাযোগ করেনি। বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নম্বরে ফোন করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, ৫ হাজার টাকা এভাবে চলে যাওয়ার কষ্ট বোঝানো কঠিন। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার টিম যদি আরও শক্তিশালী হতো, তবে হয়ত আমি বিচার পেতাম।’
১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ও সাইবার ঝুঁকি
বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ২৮ লাখ। প্রতিবছর এই খাত ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মাধ্যমে লাখ লাখ তরুণ স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও অসচেতনতার কারণে অনেকেই এই মাকড়সার জালে আটকা পড়ছেন।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘জিন্ট্রা টেক’ -এর ফাউন্ডার ও সিইও কাকন উজ্জ্বল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভুয়া এসব সাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার ফলে যুবসমাজ মারাত্মক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছে। এমনকি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও ঝুঁকিতে পড়ছে। আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বড়ো অংশই সচেতন নন। যেকোনো লিংকে ক্লিক করার কারণে হ্যাকারদের হাতে তথ্য চলে যাচ্ছে। এই নিরাপত্তাহীনতা ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা তরুণদের কর্মসংস্থানের বড়ো বাধা।’
অনলাইন প্রতারণার জাল কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ মেলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার বাহাউদ্দিন গোলাপের বক্তব্যে। তিনি জানান, তিনি নিজেও এমন অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, তাই অনলাইন সুরক্ষা এখন সবচেয়ে জরুরি। পুলিশ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী সাইবার সেল গঠন করতে হবে। যাতে প্রতারকরা ফাঁদ পাতার আগেই তা প্রতিহত করা যায়।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) -এর বরিশাল নগর সম্পাদক রফিকুল আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি অভিভাবক ও চাকরিপ্রত্যাশীদেরও সচেতন হতে হবে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাইবার সচেতনতামূলক ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা জরুরি।’
মামলার পাহাড়, কী বলছে পুলিশ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৫৩৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১০টি মামলার কার্যক্রম স্থগিত আছে। এর আগে ২০২৪ সালের জুনে বরিশাল সিটি করপোরেশন, নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতাল, বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া মো. তাওহীদ নামে এক মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করেছিল বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ।
পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠলেও তা মানতে নারাজ প্রশাসন। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ–পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল হান্নান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাৎক্ষণিক অকাট্য প্রমাণের অভাব থাকে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অনলাইনের প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং নিয়মিত মনিটরিং চলছে। অভিযোগ এলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






