logo

ময়মনসিংহ/দুর্গন্ধে যে গলি এড়িয়ে চলতেন মানুষ, আজ সেখানে ফুলের সুবাস

দুর্গন্ধে যে গলি এড়িয়ে চলতেন মানুষ, আজ সেখানে ফুলের সুবাস
ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনির গলির দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে লাল রঙের টবে লাগানো নানা প্রজাতির পাতাবাহার ও ফুলের গাছ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ময়লা-আবর্জনায় জমে থাকা দুর্গন্ধ নয়, ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনির পরিচয় এখন ফুলে ফুলে সাজানো পথ। একসময় যে পথে হাঁটতে গিয়ে অনেকেই নাক সিঁটকাতেন, সেই পথেই এখন থমকে দাঁড়ান পথচারীরা। রাস্তার পাশের দেয়াল আর তারকাঁটাজুড়ে সবুজ পাতার সমারোহ। কোথাও জবা, কোথাও জুঁই, বেলি কিংবা হাসনাহেনা। সবুজের ফাঁকে ফুটে থাকা ফুল যেন নীরবে বলে যায়, ইচ্ছা থাকলে বদলে দেওয়া যায় যেকোনো চেনা পরিবেশ।

বাঁশবাড়ি কলোনির এই পরিবর্তন কোনো বড় প্রকল্পের হাত ধরে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে চার তরুণের ভাবনা ও উদ্যোগ, যার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সীমিত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট ছোট সবুজ পরিসর। এখন সেই সবুজ শুধু কলোনির সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি করছে এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ববোধও।

কলোনিটির বদলে যাওয়া এই চিত্র নজর কেড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও। তিনি সবুজায়নের ছবি পাঠিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর কাছে। সম্প্রতি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী এবং সরেজমিনে কলোনিটি পরিদর্শন করেন। ফলে স্থানীয়ভাবে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগ এখন নগরের অন্যান্য এলাকাতেও সবুজায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

বাঁশবাড়ির পরিবর্তনের গল্পটি শুরু হয়েছিল চার বন্ধুর একটি সাধারণ ভাবনা থেকে। মুরাদ হোসেন কানন, মেহেদী হাসান মুহিত, সাইফুল ইসলাম ও উত্তম দাস চেয়েছিলেন তাদের বসবাসের জায়গাটি আরও সুন্দর হোক। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাস্তা ও নালা পরিষ্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ার পর তারা নতুন করে ভাবতে শুরু করেন পরিবেশের এই উন্নতিকে কীভাবে আরও অর্থবহ করা যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাছগুলোর পাশে ঝোলানো ছোট্ট একটি বার্তা বিশেষভাবে নজর কাড়ে ‘এ গাছগুলো বিক্রির জন্য নহে।’ কয়েকটি শব্দের এই বার্তাতেই ফুটে উঠেছে উদ্যোগটির মূল দর্শন।

উদ্যোক্তা মুরাদ হোসেন কানন জানান, আগে কলোনির রাস্তা নিচু থাকায় সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকত এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হতো। রাস্তা সংস্কারের পর চার বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নেন, আশপাশে গাছ লাগালে জায়গাটির চেহারা বদলে যাবে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করার বিষয়টি তাঁদের ভাবনায় ছিল।

সেই চিন্তা থেকেই ২০২২ সালে প্রায় ৮০০ ফুট রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর কাজ শুরু হয়। প্রথমে কাজটি কয়েকজন বন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগ থাকলেও তাঁরা এমনভাবে গাছ লাগাতে চেয়েছিলেন, যাতে অল্প জায়গার মধ্যেও সবুজের বিস্তার ঘটানো যায়। তাই শুধু মাটিতে গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যবহার করা হয় রাস্তার পাশের দেয়াল ও তারকাঁটা। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে উল্লম্ব বাগান বা ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেন’।

মুরাদ হোসেন কানন আরও জানান, ফুলের পাশাপাশি ফলজ ও ভেষজ গাছ লাগানোর বিষয়েও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়; এগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। কখনো পানি দিতে হয়, কখনো শুকনা পাতা পরিষ্কার করতে হয়, আবার কোনো গাছ নষ্ট হয়ে গেলে সেখানে নতুন চারা লাগাতে হয়। নিজেদের অর্থায়নের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় চলছে এসব কাজ।

চার বন্ধুর একজন উত্তম দাসের কাছে উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো এখন এলাকাটিকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় বাসিন্দারাও গাছের যত্ন নিচ্ছেন। বাইরে থেকে মানুষ এসে বাগান দেখে প্রশংসা করায় উদ্যোগটি ধরে রাখার আগ্রহ আরও বাড়ছে।

এই পরিবর্তনের ছোঁয়া সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন কলোনির বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা সুস্মিতা রানী জানান, আগে পরিবেশ অনেক খারাপ ছিল। এখন সবাই মিলে বাড়ির সামনের গাছগুলোতে পানি দেন ও পরিচর্যা করেন। এতে শুধু বাড়ির সামনের জায়গাই নয়, পুরো এলাকার পরিবেশ সুন্দর হয়েছে। এখন কলোনির পথ ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে নানা প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহার। রয়েছে ফলজ ও ভেষজ গাছও। জায়গার স্বল্পতা যেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত, সেখানে দেয়ালই হয়ে উঠেছে বাগানের অংশ। বাড়ির সামনের ছোট্ট জায়গা কিংবা রাস্তার পাশের অব্যবহৃত অংশও পেয়েছে নতুন রূপ।

শুধু স্থায়ী বাসিন্দারাই নন, কলোনির পরিবর্তন দেখতে আসছেন আশপাশের এলাকার মানুষও। নগরের আকুয়া এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী ফরিদুল ইসলাম বলেন, এখানে আগে এলে দ্রুত চলে যেতে ইচ্ছে করত। এখন গাছগুলো দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে মন চায়। জায়গাটা যে এত সুন্দর হতে পারে, তা ভাবিনি।

‘পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলন’-এর সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক হলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বদল। কোনো এলাকার পরিচয় শুধু তার ঘরবাড়ি বা রাস্তার অবস্থা দিয়ে তৈরি হয় না, সেই জায়গার মানুষের উদ্যোগও পরিচয় গড়ে দেয়। বাঁশবাড়িতে গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে বাসিন্দারা নিজেদের পরিবেশের প্রতি নতুন করে মনোযোগী হয়েছেন। রাস্তার পাশে গাছ বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তা রক্ষা করার দায়িত্বও। সদিচ্ছা থাকলে প্রতিটি এলাকা এমন সৌন্দর্যে মুখরিত করা সম্ভব।

বাঁশবাড়ির পরিবর্তনে সিটি করপোরেশনের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, কলোনির বাসিন্দারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে পরিবেশ সুন্দর করেছেন। তবে এই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরির পেছনে সিটি করপোরেশনের রাস্তা ও নালা পরিষ্কার এবং উন্নয়নকাজেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।

তিনি জানান, নগরের অন্যান্য কলোনির অভ্যন্তরীণ সড়কেও ফুলের টব বসানো, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং সবুজায়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।

পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, মানুষ নিজেদের বসবাসের জায়গাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করে তুলতে আগ্রহী হলে সেই অভিজ্ঞতা অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলজ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের সমন্বয়ে সবুজায়ন করা গেলে তা পরিবেশের পাশাপাশি মানুষেরও উপকারে আসবে।

তিনি আরও বলেন, নগরের অন্যান্য কলোনিতে এমন উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাঁশবাড়ির অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। দেশের অন্যান্য শহরেও এই মডেল চালু করা যায় কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে তা ভালো ফল বয়ে আনবে।