লেফটেন্যান্ট নির্জন হত্যা মামলায় ৪ আসামির মৃত্যুদণ্ড

কক্সবাজারের চকরিয়ায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে আদালত অভিযুক্ত ১৮ আসামির মধ্যে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, নয়জনকে যাবজ্জীবন ও পাঁচজনকে খালাস দিয়েছেন।
একই সঙ্গে অপর একটি অস্ত্র মামলায় ১৩ জনকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়েছেন।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আদালত ৫২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, যুক্তি-তর্ক, আসামিদের সাফাই সাক্ষী বিবেচনা করে রায় দিয়েছেন। রায় ঘোষণাকালে ১৮ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
কার কী সাজা হলো
অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, আসামিদের মধ্যে চারজনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তারা হলেন, হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন, মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, মোরশেদ আলম (পলাতক)।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, রায় ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে দণ্ডিতরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন।
এ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন জালাল উদ্দিন ওরফে বাবুল, মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, মো. আনোয়ার হাকিম, মো. জিয়াবুল করিম, মো. ইসমাঈল হোসেন ওরফে হোসেন, এনামুল হক এনাম ওরফে তোতা এনাম, মোহাম্মদ এনাম, মো. কামাল ওরফে বিন্ডি কামাল, আব্দুল করিম ওরফে মো. করিম (পলাতক)।
এ মামলায় আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে বাইট্টাইয়া, শাহ আলম, আবু হানিফ ও মিনহাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তারা খালাস পেয়েছেন। তারা সকলেই পলাতক রয়েছেন।
দণ্ডিত এবং খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
মামলার বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, এই হত্যা মামলায় সাতজন আসামি সাফাই সাক্ষী দিয়েছেন। অপরদিকে ডাকাতি মামলায় ৪৬ জন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আসামিরা সাক্ষীদের হুমকি দিয়েছিল। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামিরা স্বাভাবিক ছিলেন।
তিনি বলেন, আদালত তার অবজারবেশনে বলেছেন- একজন তরুণ কর্মকর্তা দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। তার পরিবার, দেশ, সেনাবাহিনী- সবাই ন্যায়বিচার চেয়েছিল। সবকিছু বিবেচনা করে ন্যায়বিচারের স্বার্থে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা সন্তুষ্ট।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাসনিম শিবলী বলেন, আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব। আমরা ন্যায়বিচার পাইনি।
এদিকে চাঞ্চল্যকর এ রায় রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার আদালত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। মোতায়েন ছিল অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আদালত থেকে প্রিজনভ্যানে করে কারাগারে পাঠানো হয়।
২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ২টার দিকে চকরিয়ার ডুলহাজারায় যৌথ বাহিনীর একটি দল ডাকাতি দমনে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে সেনাবাহিনীর ৩৯ এসটি ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সরওয়ার নির্জন (২৩) ডাকাতদের ধাওয়া করতে গিয়ে দুই ডাকাতকে জাপটে ধরেন।
এ সময় ডাকাতরা তানজিমের ঘাড়ে ও শরীরে ছুরিকাঘাত করে মারাত্মক জখম করে। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর ফাঁসিয়াখালী ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আব্দুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ডাকাতি ও হত্যা এবং পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করেন। মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয়। ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তদন্ত শেষে ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।
নথিতে বলা হয়, ১৭ জনের নামে মামলা হলেও হত্যাকাণ্ডে ছয়জনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়। তদন্তে এজাহারের বাইরে থাকা আরও সাতজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে ১৮ জনকে পৃথক মামলায় আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্র আদালতে গৃহিত হওয়ার পর বিচারকার্য শেষে বুধবার আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
লেফটেন্যান্ট তানজিমের বাড়ি টাঙ্গাইলে। তিনি ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেন।






