বালু খেকো ২৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট, ফেঁসে গেলেন আওয়ামী লীগ নেতা

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় এলাকায় ঐতিহ্যবাহী জাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু লুটের মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর। ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর দীর্ঘ তদন্ত শেষে মামলার ৩৭ জন আসামির মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতাসহ ১০ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলগ্রহণকারী আদালত, তাহিরপুর জোন) আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম।
সুনামগঞ্জ আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী এশিয়া পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জাদুকাটা নদীর তীর কাটার মামলার অভিযোগপত্রটি আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আদালত এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে পারেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গেল বছরের ৬ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় এলাকায় জাদুকাটা নদীর তীর কেটে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। সেসময় নৌকা ও বাল্কহেড ব্যবহার করে হাজারো মানুষের একটি সংঘবদ্ধ চক্র (মব সৃষ্টি করে) নদীর তীর কেটে বালু লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ১৫ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বাদী হয়ে তাহিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছিল।
তদন্ত শেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের দাখিল করা অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত ২৭ জনের মধ্যে রয়েছেন— তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাদাঘাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আফতাব উদ্দিন, বাদাঘাট ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি খাজা মাইনুদ্দিন, মোশাহিদ আলম ওরফে রানু মেম্বার, জামাল মিয়া, বিল্লাল মিয়া ও বোরহান উদ্দিন। মামলার পর অভিযুক্তদের অনেকেই ইতোমধ্যে আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন।
অন্যদিকে, তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় মামলার অন্যতম আসামি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিনসহ ১০ জনের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে রসালো বিষয় হলো, অব্যাহতি পাওয়া বিএনপি নেতা রাখাব উদ্দিন এবং অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা আফতাব উদ্দিন সম্পর্কে আপন ভাই।
অভিযোগপত্র নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি সব সময় জাদুকাটা নদীর তীর কাটার বিরুদ্ধে সরব ছিলাম। রাজনৈতিক প্রভাবে আমাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষ ভালো করেই জানেন কারা নদীর পাড় কেটে বালু বিক্রি করেছে।’
তবে রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘মামলার পর দুই-একজন ছাড়া প্রায় সব আসামিই এখন জামিনে আছেন। আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে যাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছি, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দিয়েছি। যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলেনি, তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।’
দলীয় বিবেচনার অভিযোগের জবাবে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘এখন মানুষ বলাবলি করছেন বিএনপির নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, অথচ বিএনপির কেউ কেউ কিন্তু এখনো অভিযুক্তের তালিকায় আছেন। আমরা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি দেখে অভিযোগপত্র দাখিল করিনি। তদন্তে যা সত্য পাওয়া গেছে, তা-ই উল্লেখ করা হয়েছে।’
জাদুকাটা নদীর তীর কেটে এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তারা দীর্ঘদিন ধরে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করে আসছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জাদুকাটা নদীর দুইটি বালুমহাল রেকর্ড ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তবে আইনি জটিলতার কারণে চলতি বাংলা সনে ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। বর্তমানে উচ্চ আদালতের একটি আদেশের বলে পূর্বের ইজারাদাররাই বালুমহাল থেকে নিয়মিত টোল আদায় করছেন।





