
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গেই ময়মনসিংহের সড়কে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নতুন ভাড়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো হাতে না এলেও নগরের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও সড়কে যাত্রীদের কাছ থেকে পরিবহনভেদে নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া। একই গন্তব্যে যেতে একেক বাসে একেক অঙ্কের টাকা দিতে হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে যাত্রীদের মধ্যে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন নগরের পাটগুদাম বাসটার্মিনাল এলাকা পরিদর্শন করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে গত সোমবার রাত ১২টা থেকে জ্বালানি তেলের নতুন দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে কার্যকর হয়েছে। এর পরদিনই ময়মনসিংহে বাসভাড়া নিয়ে এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।
বাসযাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকায় এর সুযোগ নিচ্ছেন কিছু পরিবহন শ্রমিক। যাত্রাপথের দূরত্ব কিংবা সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার হিসাব না জেনেই অনেককে চালক বা বাসের শ্রমিকের চাওয়া অনুযায়ী টাকা দিতে হচ্ছে। ভাড়া নিয়ে আপত্তি জানালে কোথাও কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও শ্রমিকদের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
নগরের পাটগুদাম বাসটার্মিনাল এলাকায় কথা হয় ঢাকাগামী যাত্রী মনিরুল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, আগে ওই এলাকা থেকে ঢাকায় যেতে পরিবহনভেদে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। এখন একই পথে ২৩০ থেকে ২৭০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, একই জায়গায় যেতে কেন একেক বাসে একেক ভাড়া দিতে হবে, সেটা যাত্রীরা বুঝতে পারছেন না। ভাড়ার তালিকা থাকলে এ ধরনের বিভ্রান্তি থাকত না।
নগরের বাইপাস মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন যাত্রী জহির আহমেদ। তিনি বলেন, ঢাকায় যাব। ইউনাইটেড বাস এখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলে না। ফলে অন্য বাস দিয়ে যেতে একেক বাসে একেকরকম ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে ভাড়া কতটা বাড়বে, সেটা সরকার ঠিক করবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তালিকা না থাকলে যাত্রী বুঝবেন কীভাবে তিনি সঠিক ভাড়া দিচ্ছেন কি না? এখন যে যার মতো টাকা চাইছে।
শুধু ঢাকাগামী বাস নয়, ময়মনসিংহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। তাদের ভাষ্য, তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া বাড়বে—এটি তারা বুঝতে পারছেন। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন ভাড়া কত, তা স্পষ্ট না হওয়ায় এখন যাত্রীদেরই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
তবে সব পরিবহনে একই চিত্র নয়। নগরের মাসকান্দা বাসটার্মিনাল থেকে ইউনাইটেড পরিবহনের নন-এসি বাসগুলো ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আগের ৩১০ টাকা ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন করছে বলে জানা গেছে।
চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের একটি অংশের বক্তব্য, নতুন ভাড়ার সরকারি তালিকা তাদের হাতে পৌঁছায়নি। ফলে কোন রুটে কত টাকা নিতে হবে, সে বিষয়ে তাদের কাছেও পরিষ্কার নির্দেশনা নেই। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের নতুন দামের কারণে পরিবহন পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তবে যাত্রীদের প্রশ্ন, নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত ইচ্ছামতো বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ কোথায়? তাঁদের মতে, ভাড়া সমন্বয় হবে স্বাভাবিক। তবে সরকারিভাবে নির্ধারিত হার প্রকাশ করে তা সব বাসে দৃশ্যমানভাবে টানিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিক— দুই পক্ষেরই বিভ্রান্তি কমবে।
এমজি ট্রাভেলসের চালক আব্দুল মজিদ জানান, তারা ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন না। ফলে যাত্রীর অভাব পড়ছে না।
ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে নিয়মিত বাস চালান ফরিদ মিয়া। তিনি বলেন, পাম্প থেকে সরকার নির্ধারিত দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এজন্য আগের চেয়ে কিছুটা বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। তবে আমি ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছি না।
নগরের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত চাঁন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. বাদশা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। সে অনুযায়ী তেল বিক্রি করছি।
বক্তব্য জানতে ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর মাহমুদ আলমের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও সারা পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস পাঠালেও সদুত্তর দেননি তিনি।
তবে বিআরটিএ ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক মো. আনিসুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, নতুন ভাড়ার তালিকা বিআরটিএর প্রধান কার্যালয় থেকে নির্ধারণ করা হবে। তালিকা এখনো তাদের হাতে পৌঁছায়নি। তবে আজ বা কালকের মধ্যে সেই তালিকা পাওয়া যাবে। এরপর তালিকা অনুযায়ী ভাড়া আদায় নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে সড়কে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চলছে। কোনো পরিবহন ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছে—এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়। এবার নতুন করে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সোমবার বাস মালিকদের সংগঠনগুলো দূরপাল্লার পথে কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিবহন মালিকদের বৈঠকে ভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হয়।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, ৫২ আসনের বড় বাস ও ৩০ আসনের মিনিবাসের হিসাব ধরে ভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দূরপাল্লার অনেক পরিবহনে আসন কমিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি জায়গা রেখে যাত্রী পরিবহন করা হয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ভাড়ার পার্থক্য হতে পারে।

