logo

ইউরোপের স্বপ্নে বসতভিটা বন্ধক, বন্দিশালায় আটকে দফায়-দফায় টাকা নিচ্ছে দালাল

ইউরোপের স্বপ্নে বসতভিটা বন্ধক, বন্দিশালায় আটকে দফায়-দফায় টাকা নিচ্ছে দালাল
লিবিয়ায় দালালের বন্দিশালায় জিম্মি হয়ে আছেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার যুবক মেহেদী হাসান। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দালালের মাধ্যমে চুক্তি করেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার যুবক মেহেদী হাসান। বসতভিটা বন্ধক রেখে দালালকে টাকা দিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান তিনি। সেখানে পৌঁছে দালালের বন্দিশালায় জিম্মি হয়ে আছেন মেহেদী। তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করে ভিডিও পাঠানো হচ্ছে পরিবারের কাছে। দফায়-দফায় পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১৭ লাখ টাকা। মেহেদীর মুক্তির জন্য আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করেছে দালালরা।

মেহেদী হাসান শিবচর উপজেলার বাশকান্দি ইউনিয়নের ছলেনামা বাজিতপুর এলাকার রহমান শিকদারের ছেলে। স্থানীয় একটি কম্পিউটারের দোকানে চাকরি করতেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো এবং ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় স্থানীয় সাগর মিয়ার মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার উদ্যোগ নেন মেহেদী।

পরিবার জানায়, ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে সাগর মিয়ার সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। এই টাকা জোগাড় করতে বসতভিটা বন্ধক রাখার পাশাপাশি বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মেহেদীকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর কয়েকদিন পর একটি চক্র মেহেদীকে আটক করে। তার ওপর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়।

ভিডিও দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তার বাবা-মা। ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য আবার ধারদেনা করেন তারা। একপর্যায়ে বসতভিটা বন্ধক রেখে আরও প্রায় ১৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা পাওয়ার পর মেহেদীকে কিছু সময়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলেও পরে আবার তাকে জিম্মি করা হয়। প্রায় তিন মাস ধরে তিনি ওই চক্রের হাতে জিম্মি। তার মুক্তির জন্য আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে।

মেহেদীর বাবা রহমান শিকদার বলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর পর থেকে আমাদের পরিবার নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। ছেলেকে বাঁচাতে অনেক টাকা দিয়েছি। এখন আর টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই।

বন্দিশালা থেকে পরিবারের কাছে দালালের পাঠানো মেহেদীর ছবি।
বন্দিশালা থেকে পরিবারের কাছে দালালের পাঠানো মেহেদীর ছবি।

মেহেদীর মা আম্বিয়া খাতুন বলেন, আমরা শুধু আমাদের সন্তানকে জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরে পেতে চাই। টাকার জন্য আমার ছেলেকে যেভাবে মারধর করে, তা দেখলে আমার বুক ফেটে যায়। আমি মা হয়ে এটা সহ্য করতে পারি না। আমার কিছু নেই—সব দিয়ে শেষ করেছি। এখন শুধু ঋণ আছে।

স্থানীয় দালাল সাগর মিয়ার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে খুঁজে না পেয়ে তার ফোনে কল দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে বাড়িতে গিয়েও তাকে ও পরিবারের কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি।

সাগরের প্রতিবেশী রেজাউল মিয়া বলেন, সাগর বিদেশে লোকজন পাঠায়, এটা জানি। মেহেদীর সঙ্গে যা হয়েছে তা আমরা জানি না।

এ বিষয়ে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ গমন ব্যক্তি ও দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার রোধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতা ও সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।