দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ভৈরব নদ, ঝুঁকিতে নৌবন্দর

এশিয়া পোস্ট নিউজ, যশোর
দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ভৈরব নদ, ঝুঁকিতে নৌবন্দর
দখল হয়ে যাচ্ছে ভৈরব নদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অবৈধ দখল, প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে খুলনাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ভৈরব নদ। এর ফলে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ নওয়াপাড়া নৌবন্দরের কার্যক্রম। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খনন ও একাধিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা যায়, খুলনার মজুদখালি থেকে যশোরের আফরা পর্যন্ত নদীর দুই তীরের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় নদী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অভয়নগরের ভাটপাড়া থেকে মহাকাল শ্মশানঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার এলাকায় নদী দখল ও অবৈধ স্থাপনার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর দুই তীরে মাটি, বালু, কাঠ, বাঁশ, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত অবৈধ ঘাট, জেটি, গুদাম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনাই নয়, নদীর জায়গা দখল করে কিছু সরকারি স্থাপনা নির্মাণেরও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আঞ্চলিক কর কমিশনারের কার্যালয় ও নওয়াপাড়া হাইওয়ে থানার সীমানাপ্রাচীর নদীর জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া নওয়াপাড়া মাছবাজার থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে, একটি অটো রাইস মিল এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর গুদামঘর নদীর ভেতরেই নির্মাণ করা হয়েছে।

২০০৬ সালে নওয়াপাড়াকে নদীবন্দর ঘোষণা করার পর থেকেই মূলত নদী দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৫৯টি, ২০২০ সালে ২৫টি, ২০২২ সালে দুই দফায় ৭৫টি এবং ২০২৪ সালে আরও ২৪টি অবৈধ জেটি ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো আবারও পুনর্নির্মিত হয়।

এশিয়া পোস্ট
এশিয়া পোস্ট

নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, বর্তমানে নদীতে ১০৪টি অবৈধ জেটিসহ অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে। প্রতিবছর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়। ঈদের পর আবারও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৪৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ভৈরব নদ খনন প্রকল্প শুরু হয়, যা ২০২০ সালের মধ্যে সাড়ে ২৭ কিলোমিটার খনন কাজ সম্পন্ন করে। বর্তমানে নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের অংশ হিসেবে দুটি ড্রেজার ও দুটি লং বুম দিয়ে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পলি অপসারণ করা হচ্ছে বলে জানান বিআইডব্লিউটিএ নওয়াপাড়া নৌবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহাবুল ইসলাম।

তবে এই ড্রেজিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন নওয়াপাড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক নিয়ামুল হক রিকো বলেন, ড্রেজিং কার্যক্রমে চরম পরিকল্পনাহীনতা রয়েছে। নদীর মাঝখানে সরু চ্যানেল কেটে দুই পাশ অসমভাবে খনন করার ফলে নদী আরও দ্রুত নাব্যতা হারাচ্ছে।

এদিকে নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজগুলোকে জোয়ারের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেন জানান, নদীর মাঝে চর জেগে ওঠায় কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে গম, চাল ও কয়লা পরিবহনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, নওয়াপাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দরে নদীতীর দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রশাসনের উচিত অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের এবং সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা।

তিনি বলেন, নদী ও নৌবন্দর রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য। অন্যথায় দেশের অন্যতম বৃহৎ এই নৌবন্দর অচিরেই তার কার্যকারিতা হারাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।

বিষয় :যশোর