সাড়ে তিন বছর ধরে বিকল চমেকের ম্যামোগ্রাফি যন্ত্র

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের একমাত্র ম্যামোগ্রাফি যন্ত্রটি দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। স্তন ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা মূল্যের এই যন্ত্রটি বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ও দরিদ্র রোগীরা। সরকারি এই হাসপাতালে যে পরীক্ষার খরচ ছিল মাত্র ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা, সেটি এখন বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রায় চার গুণ বেশি (৩ থেকে ৪ হাজার টাকা) খরচ করে করতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। দুই দফা জরুরি চিঠি পাঠিয়েও যন্ত্রটি মেরামতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাড়া পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর (সিএমএসডি) মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য ইতালি থেকে দুটি ম্যামোগ্রাফি যন্ত্র আমদানি করা হয়। ২০১৭ সালের মার্চে চমেক হাসপাতালে যন্ত্রটি আসার পর প্রায় দেড় বছর সেটি বাক্সবন্দি ছিল। বারবার চিঠি দেওয়ার পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউটেক জিটি লিমিটেড’ ২০১৮ সালের আগস্টে এটি স্থাপন করে। তবে চালুর পর থেকেই যন্ত্রটিতে দফায় দফায় ত্রুটি দেখা দেয়।
২০১৮ সালের ১ আগস্ট চালুর মাত্র ছয় মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবার বিকল হয় এটি। ২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রথম দফা মেরামত করা হলেও তা টেকেনি চার মাসের বেশি। ওই বছরের নভেম্বরে আবার নষ্ট হলে ২০২১ সালের জুনে তৃতীয় দফায় মেরামত করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার বিকল এবং জুনে চতুর্থ দফা মেরামতের পর ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কোটি টাকার এই যন্ত্রটি। ২০১৮ সালে চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত চার দফায় এটি নষ্ট হলো।
চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রটির ওয়ারেন্টির মেয়াদ ৩ বছর। চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘ ৮ বছরে যন্ত্রটি সচল ছিল মাত্র দুই বছরের মতো। যেহেতু অচল থাকার সময়কাল ওয়ারেন্টির অন্তর্ভুক্ত নয়, সে কারণে এটি সচল ও মেরামতের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের।
তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিউটেক জিটি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মালয়া কুমার মোহন্ত এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, যন্ত্রটির ওয়ারেন্টি আর অবশিষ্ট নেই। ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ার পরও আমরা একাধিকবার নিজ উদ্যোগে এটি মেরামত করেছি।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের ভেতরে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং ফিজিক্যাল ড্যামেজের কারণে এটি বারবার নষ্ট হয়েছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ‘ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপের’ মাধ্যমে বিষয়টি জানানো যেতে পারে।
চমেক হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালের পর থেকে বারবার বিকল হওয়া এই যন্ত্রটি নিয়ে এ পর্যন্ত সিএমএসডির পরিচালক বরাবর ২৫ বার চিঠি পাঠানো হয়েছে। সবশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিএমএসডির পরিচালককে দেওয়া এক চিঠিতে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে যন্ত্রটি বন্ধ থাকায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালের রোগীদের স্বার্থে রেডিওলজি বিভাগের একমাত্র ম্যামোগ্রাফি মেশিনটি দ্রুত মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।
এ বিষয়ে চমেক হাসপাতালের রেডিওলজি এবং ইমেজিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. কাজী মোহাম্মদ আলম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যন্ত্রটি আমি সচল পাইনি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন এসে দুবার দেখে গেছে, কিন্তু কোনো কাজ করেনি। যন্ত্রটি চালু থাকলে রোগীরা সামান্য খরচে সেবা পেতেন। এখন নিরুপায় হয়ে রোগীদের বাইরে থেকে বেশি খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমান যন্ত্রটি মেরামতের জন্য যেমন শেষ চেষ্টা চালানো হচ্ছে, তেমনি পাশাপাশি একটি নতুন ম্যামোগ্রাফি মেশিন কেনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।





