চসিকের ইতিহাসে রেকর্ড রাজস্ব আদায়

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একক কোনো খাত থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের নতুন নজির স্থাপিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকার চেক গ্রহণ করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে চসিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মেয়র এই ঐতিহাসিক অর্জনের তথ্য জানান। একই সঙ্গে এই বিপুল রাজস্ব নগরীর অবকাঠামো ও শিক্ষা খাতের উন্নয়নে ব্যয়ের বিস্তারিত মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
মেয়র জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত কম হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করে আসছিল। চসিকের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আইনি ভিত্তিতে ন্যায্য কর আদায়ের উদ্যোগ নেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত উভয় প্রতিষ্ঠানের ছয়জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ মূল্যায়ন’ (জয়েন্ট অ্যাসেসমেন্ট) পরিচালিত হয়। এতে বন্দরের প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ বর্গফুট স্থাপনার মূল্যায়ন সম্পন্ন হয় এবং উভয় পক্ষ এতে স্বাক্ষর করে।
পরে বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করলেও সিটি করপোরেশন আইনের বিধান অনুযায়ী আপিল গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ অর্থ (১৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা) চসিককে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ অর্থও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদায় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মেয়র।
বন্দরের ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে চসিকের সড়কগুলোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে ডা. শাহাদাত বলেন, সিটি করপোরেশন বন্দরের কাছ থেকে কোনো ধরনের কম্পেনসেশন চার্জ (ক্ষতিপূরণ) নেয় না। অথচ তাদের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী যানবাহন চসিকের রাস্তা ব্যবহার করায় প্রতি বছর সড়ক সংস্কারেই অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। আমরা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা চাইনি, শুধু আইনি ন্যায্য কর দাবি করেছি।
এই রাজস্বের অর্থ দিয়ে দেওয়ানহাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ করিডোরকে আরসিসি সড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভারী যানবাহনের চাপ সামলাতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়ক এবং ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেওয়ানহাট ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আদায় করা অর্থ সম্পূর্ণভাবে নগরবাসীর কল্যাণে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়র বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনটি খাতে কাজ করা হবে। এর মধ্যে শিক্ষা খাতে ঝুকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবন সংস্কার, পুনর্নির্মাণ এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা। নগর অবকাঠামো খাতে নতুন রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণ, প্রতিরোধ দেয়াল এবং আধুনিক সড়কবাতি স্থাপন। নাগরিক সেবা খাতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার ও উন্নতমানের মশকনিধক ওষুধ কেনার কথা জানান মেয়র।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বন্দর ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে চসিকের আরও প্রায় ১৯৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। বকেয়া পরিশোধের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) পাঠানো হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চসিকের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করার কাজ চলছে বলে জানান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, আবাসিক করদাতাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় কর ও সারচার্জে কিছু ছাড় দেওয়া হলেও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। কর ফাঁকি রোধে সিটি করপোরেশন কঠোর অবস্থানে থাকবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামাল এবং প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।






