মাছি পোকার হানায় ফজলি আমচাষিদের মাথায় হাত

আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ঐতিহ্যবাহী ফজলি আম চাষ এখন প্রান্তিক চাষিদের জন্য চরম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমে ‘ফ্রুট ফ্লাই’ বা মাছি পোকার ভয়াবহ আক্রমণে জেলার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ফজলি আম নষ্ট হচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়ে অনেক চাষি বাধ্য হয়ে বংশপরম্পরার পুরনো ফজলি আম গাছ কেটে ফেলছেন।
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার টন। কিন্তু মাছি পোকার উপদ্রব চাষিদের সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছে থাকা ফজলি আমে মাছি পোকা আক্রমণ করছে। পোকা আমের গায়ে ছিদ্র করে ডিম পাড়ায় ভেতরে পচন ধরছে এবং আম ঝরে পড়ছে।
শিবগঞ্জের মনাকষা ইউনিয়নের পারচৌকার আমচাষি সানাউল্লাহ জানান, কয়েক দফার অতিবৃষ্টি ও আবহাওয়া পরিবর্তনের পর তার প্রায় ৭ বিঘা জমির বাগানের প্রায় ৫০ শতাংশ আম নষ্ট হয়ে গেছে। একই এলাকার চাষি আশরাফুল ইসলাম বলেন, একসময় ভালো মানের ফজলি আম পাঁচ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও এখন সেই আম মাত্র ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ না ওঠায় বাধ্য হয়ে গত বছর আমি পাঁচটি বড় ফজলি গাছ কেটে ফেলেছি এবং এবারও আরও ছয়টি গাছ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, জেলার ল্যাংড়া, খিরসাপাত বা আশ্বিনার মতো ফজলি আমও জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর সুফল মিলছে না। ফজলির গাছগুলো বেশির ভাগই বংশপরম্পরায় পাওয়া, পুরনো এবং আকারে অনেক বড়। বড় গাছ হওয়ায় এতে সার ও কীটনাশক স্প্রে করতে বাড়তি শ্রম ও খরচ হয়, অপচয়ও হয় বেশি।
কানসাটের আম ব্যবসায়ী আমিরুল ইসলাম জাকির জানান, মাছি পোকার আক্রমণে আমে ছিদ্র ও পচন ধরায় বাজারে এর চাহিদা ও কদর দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে ভালো মানের ফজলি আম মাত্র সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে পোকা দমনে চাষিরা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘ফেরোমন ফাঁদ’ ব্যবহার করছেন। ২৫০ টাকা মূল্যের এই ফাঁদ মূলত কৃত্রিম নারী পোকার গন্ধের সাহায্যে পুরুষ মাছি পোকাকে আকর্ষণ করে ধ্বংস করে। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে এই পদ্ধতিও পুরোপুরি কাজ করছে না। অন্যদিকে, আমকে পোকার হাত থেকে বাঁচাতে ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ অন্যতম কার্যকর উপায় হলেও বাজারে নিম্নমানের ব্যাগের ছড়াছড়ি চাষিদের আরও বিপদে ফেলেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম অভিযোগ করেন, বাজারে নিম্নমানের ফ্রুট ব্যাগ আমদানি ও বাজারজাতকরণ ঠেকাতে কৃষি বিভাগের কার্যকর কোনো তদারকি (মনিটরিং) নেই। ফলে নিম্নমানের ব্যাগ ব্যবহার করেও আম রক্ষা করা যাচ্ছে না।
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া জানান, সঠিক নিয়মে ও নিয়মিত স্প্রে করলে মাছি পোকার আক্রমণ কম হয়। তবে ঠিক কতগুলো বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য বর্তমানে কৃষি বিভাগের কাছে নেই। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত আমচাষিদের জন্য সরকারি কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, মাছি পোকার আক্রমণ নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ পোকা আমের ক্ষতি করে আসছে। এটি মূলত ফলের পোকা হলেও ফজলি আমে এর আক্রমণে ক্ষতি বেশি হয়। মাছি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে চাষিদের ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আম রক্ষায় ফ্রুট ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণেই এবার মাছি পোকার উপদ্রব বেড়েছে। চাষিদের ভালো মানের ফ্রুট ব্যাগ ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের পাশাপাশি ক্ষতি এড়াতে নাবি জাতের আম চাষে আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
.png)





