কথিত পীরকে গুমের অভিযোগে আদালতে মামলা

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামের কথিত পীর গয়েছ মিয়াকে (৩৫) অপহরণ ও গুমের অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
নিখোঁজ গয়েছ মিয়ার বাবা আব্দুর রহিম বাদী হয়ে গত ১২ জুলাই সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার আমলি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। তবে মামলার আসামিরা জানান, গ্রামের লোকজনকে হয়রানি করার জন্য মিথ্যা মামলা করা হয়েছে।
নিখোঁজ গয়েছ মিয়াকে স্থানীয় কবিরাজ উল্লেখ করে মামলায় বলা হয়েছে, গত ২৪ জুন নিজ চিকিৎসালয় (কুঁড়েঘর) থেকে তাকে অপহরণ ও গুম করা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ঘটনাটি তদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার আসামি করা হয়েছে একই গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা মো. কামাল উদ্দিন (৫৫), গয়েছ মিয়ার হাতে খুন হওয়া প্রবাসী জাকির হোসেনের বাবা রুহুল আমিন রুপাই (৫২), গ্রামের কাদির মিয়া (২৮), জিয়াউল হক (৪০), আলামিন সিরাজী (৩০), কর্নেল (২৫), হাবিবুর রহমান (২৩), আশিক মিয়া (৩২), আনফর আলী (৪৫), পাপলু মিয়া (২২) ও রাজীব মিয়া (২৫)।
মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী নাজমুল হুদা হিমেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, আদালত আব্দুর রহিমের অভিযোগটি গ্রহণ করে আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ডিবি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হজরত আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই মামলাটির নির্দেশনা সোমবার দুপর পর্য়ন্ত তিনি পাননি। মামলার কাগজপত্র পাওয়ার পর তদন্ত করে দেখবেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গয়েছ মিয়া বাজিতপুর গ্রামের উত্তর পাশে জঙ্গলঘেরা একটি বটগাছের নিচে কুঁড়েঘরে থেকে কবিরাজি চিকিৎসা করতেন। চিকিৎসায় পরিচিতি পাওয়ায় স্থানীয় একটি পক্ষ তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি দেয়। নিজের নিরাপত্তা চেয়ে গত ২২ জুন তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই আবেদনের জেরে প্রতিপক্ষ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ২৪ জুন ভোর ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার কুঁড়েঘরে হামলা চালায় এবং তাকে অপহরণ করে গুম করে। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন কুঁড়েঘরে কোনো সাড়া না পেয়ে স্বজনদের খবর দেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা বিছানায় রক্তের দাগ দেখতে পান বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নিখোঁজ গয়েজ মিয়ার বাবা বাদী আব্দুর রহিম বলেন, ২০২০ সালের একটি হত্যা মামলার পর থেকে তারা সিলেটে বসবাস করছেন। ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে এলাকায় এসে থানায় মামলা করতে চাইলেও অভিযোগ নেওয়া হয়নি। পরে আদালতের শরণাপন্ন হন। এখনও ছেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
মামলার প্রধান আসামি মাওলানা মো. কামাল উদ্দিন এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গয়েছ মিয়াকে কেউ অপহরণ বা গুম করেনি। গ্রামবাসীকে হয়রানি করতেই এ মামলা করা হয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহ বলেন, গয়েছ মিয়া তার কাছে আবেদন করেছিলেন কি না, তা এই মুহূর্তে মনে নেই। আবেদন করে থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়ে থাকবে।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, গয়েছ মিয়া কবরস্থানে অবস্থান করে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগে প্রশাসন তাকে স্থান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে তার বাবা মৌখিকভাবে ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি।
২০২০ সালের ৪ এপ্রিল পূর্বশত্রুতার জেরে জাকির হোসেন নামে এক প্রবাসীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে গয়েছ মিয়ার বিরুদ্ধে। দেড় বছর কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে তিনি নিজেকে ‘স্বপ্নে আদিষ্ট পীর’ দাবি করে স্থানীয় কবরস্থানের নির্জন জঙ্গলে আস্তানা গড়ে তোলেন।
এর আগে, গয়েছ মিয়াকে নিয়ে গত ২০ জুন এশিয়া পোস্টে ‘জামিনের পর পীর সেজে কবরস্থানে আস্তানা হত্যা মামলার আসামির’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর উপজেলা প্রশাসন থেকে তাকে কবরস্থান এলাকা আস্তানা নিয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানান, ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল পূর্বশত্রুতার জেরে জাকির হোসেন নামে এক প্রবাসীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে গয়েছ মিয়ার বিরুদ্ধে। দেড় বছর কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে তিনি নিজেকে ‘স্বপ্নে আদিষ্ট পীর’ দাবি করে গ্রামের শতবর্ষী পঞ্চায়েতি কবরস্থানের একটি বড় গাছের নিচে বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি দোতলা ঘরে বসবাস শুরু করেন। মাথায় সাদা পাগড়ি ও হাতে লোহার রড নিয়ে চলাফেরা করতেন। এতে করে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
.png)






