
কৃষকের ফসল সংরক্ষণে সরকারি খরচে স্থাপিত ‘ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ’-এর অকার্যকারিতা নিয়ে এশিয়া পোস্টে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্তে নামে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান শেষে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত এসব হিমাগারের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি, বর্তমান বাস্তবতায় এ প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় উল্লেখ করে নতুন করে সম্প্রসারণের আগে অধিকতর গবেষণার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
এর ফলে সৌরশক্তিনির্ভর আরও ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে প্রস্তাবিত প্রায় ৫০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমলে নেওয়া হলে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ অপচয় ও সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
গত ৬ জুলাই এশিয়া পোস্টে ‘কৃষিমন্ত্রীর এলাকায় কৃষি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ’ শিরোনামে ওয়েবে এবং ‘প্রচারণায় সচল, বাস্তবে অচল সরকারি মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ শিরোনামে মাল্টিমিডিয়ায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হিমাগারগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিদ্যুৎ সংকট, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং সংরক্ষিত ফসলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার কারণে অধিকাংশ হিমাগার বন্ধ রয়েছে এবং কৃষকেরা প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না।
প্রতিবেদনটি নজর কাড়লে ডিএই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সম্প্রতি কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
মাঠে গিয়ে যা পেল তদন্ত কমিটি
ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রওশন আলমের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ তদন্ত দল দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ২৬টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ সরেজমিন পরিদর্শন করে। তদন্তে দেখা যায়, অধিকাংশ হিমাগারই বন্ধ পড়ে আছে। যেগুলো চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোও প্রত্যাশিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎনির্ভর হওয়ার কথা থাকলেও অনেক মিনি কোল্ড স্টোরেজে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যাকআপ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য সাধারণ বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়।
এ ছাড়া হিমাগারে সংরক্ষণের পরও বিভিন্ন ফল ও সবজির গুণগত মান ঠিক থাকছে না। ফলে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিমাগার পরিচালনার খরচও উঠছে না বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
কুমিল্লায় সংরক্ষিত পণ্য নষ্ট হওয়ার তথ্য
কুমিল্লায় তদন্ত কমিটিকে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, মিনি কোল্ড স্টোরেজে পোস্ট কুলিং করার পরও সবজির গুণগত মান ভালো থাকছে না। অনেক পণ্য কুঁচকে যায় এবং রং পরিবর্তন হয়। আলু ১৫ দিনের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে যায়। পেয়ারা ও ড্রাগন ফলও কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায়।
গাজীপুরের মাওনা উপজেলার কাওরান বাজারের কৃষক বাইজিদ ইসলামও তদন্ত কমিটিকে একই ধরনের সমস্যার কথা জানান। তার মতে, গাজরে স্প্রাউটিং হয়, কাঁচা মরিচের রং পরিবর্তন হয়ে যায়, বেগুন ও শসা কুঁচকে যায় এবং ড্রাগন ফলের কিছু অংশ পচে যায়।
বিদ্যুৎ সংকট বড় বাধা
তদন্ত কমিটির সদস্য ও জয়দেবপুর ফল বিভাগের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মসিউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেশে বিদ্যুৎ সংকট ও ব্যাকআপ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকা এবং গ্রামাঞ্চলে দৈনিক কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং মিনি কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। সৌরবিদ্যুৎ কিছু সময়ের জন্য ব্যাকআপ দিতে পারে, কিন্তু এটি সব ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান নয়।
ড. মসিউর রহমান আরও বলেন, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের অভাবে কৃষকেরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি একই চেম্বারে সংরক্ষণ করেন। এতে এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের মিথস্ক্রিয়ার কারণে গুণগত মান নষ্ট হতে পারে।
তার মতে, প্রতিটি ফসলের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এক নয়। কোনো ফসল ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ভালো থাকে, আবার কোনো ফসলের জন্য ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা প্রয়োজন। ফলে একাধিক ধরনের পণ্য সংরক্ষণ করতে হলে একাধিক চেম্বারের প্রয়োজন হতে পারে।
ড. মসিউর রহমান বলেন, বিদেশের কোনো প্রযুক্তি দেশে সম্প্রসারণের আগে গবেষণা করে তার ফলাফলের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা উচিত। তা না হলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫০ মিনি হিমাগার
ডিএই-এর তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দুটি পৃথক প্রকল্পের আওতায় মোট ১৮০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’ শুরু হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। প্রকল্পটির আওতায় ১০০টি স্টোরেজ স্থাপনের কথা থাকলেও বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে ৫০টি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন প্রকল্প’-এর আওতায় ৮০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫০টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
দুই প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রত্যাশিত সুফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে।
সামনে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প
বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবতা নিয়ে এমন প্রশ্নের মধ্যেই আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সৌর প্যানেলনির্ভর আরও দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কৃষককে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এই পরিকল্পনার ভিত্তিতে ‘সৌরশক্তিনির্ভর মিনি হিমাগার ও ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়।
তবে বিদ্যমান মিনি কোল্ড স্টোরেজগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে ডিএই-এর সরেজমিন তদন্তের পর নতুন প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট, পরিচালন ব্যয়, সংরক্ষিত পণ্যের গুণগত মান, কৃষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো এখন নতুন করে বিবেচনায় আসছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় উল্লেখ করে এখনই এর সম্প্রসারণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিটি আরও কার্যকর করতে অধিকতর গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনের পর তদন্ত
গত ৬ জুলাই এশিয়া পোস্টে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সরকারি অর্থে নির্মিত মিনি কোল্ড স্টোরেজগুলোর অকার্যকারিতা, কৃষকদের অসন্তোষ এবং প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। প্রতিবেদনের পর বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রওশন আলম। সদস্য ছিলেন ডিএই-এর পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের উপপরিচালক (প্রকল্প বাস্তবায়ন) ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন শরীফ, জয়দেবপুর ফল বিভাগের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মসিউর রহমান, মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. আবু সাইয়েম।
সারাদেশে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে দেওয়া প্রতিবেদনে মিনি কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থেই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল।
তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের আগে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, পরিচালন ব্যয়, বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা, ফসলভেদে সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৃষকের ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে গবেষণা করা হলে প্রস্তাবিত ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
অর্থাৎ, এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে যে প্রশ্ন উঠেছিল সরকারি অর্থে নির্মিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ আসলে কৃষকের কতটা কাজে আসছে দীর্ঘ তদন্তের পর সরকারি প্রতিবেদনেও সেই প্রশ্নেরই প্রতিফলন ঘটেছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ আমলে নিয়ে প্রস্তাবিত ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় সরকার, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


