
উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বাড়বে পানি প্রবাহ, তৈরি হবে দুই পাড়ে চলাচলের রাস্তা, লাগানো হবে হাজারো গাছ। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা টিকেছে মাত্র কয়েক মাস। কাজ শেষ হওয়ার প্রায় সাত মাসের মধ্যেই জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পলিশাহ খালের বিভিন্ন স্থানে পাড় ধসে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের পশ্চিম পলিশা মোড় থেকে দুধিয়াগাছা পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে প্রকল্পের ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৯ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠিয়ে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।

উপজেলা প্রশাসনের দাবি, প্রকল্প অনুযায়ী খালের প্রস্থ ৯ দশমিক ১৬ মিটার ও গভীরতা চার মিটার নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে খালের দুই পাশে পাঁচ ফুট প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ এবং ২ হাজার ৬০টি গাছ লাগানো হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে শ্রমিক দিয়ে পাড় মজবুত করার কথা থাকলেও অধিকাংশ কাজ শুধু ভেকু (খননযন্ত্র) দিয়ে করা হয়েছে। ফলে পাড় শক্ত না হওয়ায় বৃষ্টির পানিতে দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের কয়েকটি অংশে পাড় ধসে পড়েছে। কোথাও কোথাও ভাঙনের কারণে কৃষিজমির অংশ খালে বিলীন হয়ে গেছে। কিছু স্থানে রাস্তার পাশেও ধস দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খোকন বলেন, খালের দুই পাশে রাস্তা ঠিকভাবে হলে পাড় এত সহজে ভাঙত না। এখন পাড় ধসে মাটি আবার খালের মধ্যেই চলে যাচ্ছে। এতে একদিকে জমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে খালও ভরাট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, খালের পাড় ঘেঁষা দুই বিঘা জমিতে আমি এবার ধানের আবাদ করেছি। কিছুদিন আগে খালটি খনন করা হয়েছে। শ্রমিক দিয়ে খালের পাড় ভালো করে দুরমুজ করা হতো এবং দুই পাড়ে গাছের পাশাপাশি যদি ঘাস লাগানো হতো, তাহলে পাড় ধসে যেত না। কিন্তু এখানে এসবের কিছুই করা হয়নি।
স্থানীয় কৃষক মো. সিরাজুল বলেন, এখানে শুধু ভেকু দিয়ে খালের তলা থেকে কিছু মাটি তোলা হয়েছে। লোকজন দিয়ে দুই পাড়ের কোনো কাজ করা হয়নি। এখানে দুই পাড়ে রাস্তা করা হলে মানুষ চলাচল করতে পারলে পাড় আর ধসে পড়ত না।
প্রকল্পের সভাপতি ও আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রকিবুল হাসান বলেন, এই খালটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে পুনরায় খাল খনন শুরু হয়। এখানে পাঁচ ফুটের রাস্তা করা হয়েছিল। ভারী বৃষ্টির কারণে কিছু কিছু অংশ ধসে পড়েছে। সেখানে লাগানো গাছগুলো পড়ে গেছে। খাল খননে এলাকার মানুষের উপকার হয়েছে। আর আমাদের এই প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ করেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজান।

এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান রতন বলেন, কাজটি করেছে পিআইও অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদ। আমি এমপির নির্দেশে তদারকি করেছি। এখানে আমার কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, খালের পাড়ের সবই ঠিক ছিল। কিন্তু মাঝখানে অনেক বৃষ্টিপাত হয়েছে। যেহেতু পুরোটা বালু ছিল, বৃষ্টির সময় বালুর পাড় ভেঙে পড়ে। ওই পাশে যে গাইডওয়াল ছিল, অতিরিক্ত পানি আসার কারণে সেটিও ভেঙে পড়ে। খালের জন্য রাস্তা ভেঙে পড়ছে, বিষয়টা তা নয়।
তিনি আরও বলেন, যেসব জায়গায় পাড় ভেঙে গেছে, সেসব জায়গার গাছ পড়ে গেছে। যেসব জায়গায় ভাঙেনি, সেসব জায়গার গাছ ঠিক আছে। যে টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে, সেই টাকা আমাদের কাছে আসার কথা। টাকা আসলে আমরা পাড় মেরামত ও গাছগুলো লাগাব। আর যে রাস্তাটি ভেঙে গেছে, সেটা এলজিইডির রাস্তা। সড়কটি জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এলজিইডির প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে।