Advertisement

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস/উদ্বেগের মধ্যেও সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খুলনা
উদ্বেগের মধ্যেও সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা
আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিসের সামনে বাঘের উপস্থিতি। গত ২৪ জুলাই সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকা থেকে তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। এবার বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’। বহুমুখী সংকটের মধ্যেও সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। সবশেষ শুমারি অনুযায়ী – সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১২৫টি বাঘের বিচরণ রয়েছে; যা এর আগের শুমারিতে নিশ্চিত হওয়া সংখ্যার চেয়ে ১১টি বেশি।

দেশে বাঘের গুরুত্ব দেখতে গেলে সামনে আসে নানা বিষয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে বাঘ জাতীয় পশু। ক্রীড়াঙ্গনে বাগের ইংরেজি টাইগার শব্দের ব্যববহার ব্যাপক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোগোতে রয়েছে বাঘ। এসব ছাপিয়ে সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগেরও শেষ নেই।

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাঘের সংখ্যা বাড়লেও তাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য ও কার্যকর সুরক্ষার সংকট কাটেনি। শিকারি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বন ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) এখনও সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে ‘ক্রিটিক্যালি এন্ডেঞ্জার্ড’ বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত রেখেছে। শুধু বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি সংরক্ষণের সাফল্যের প্রমাণ নয়; দীর্ঘমেয়াদে তাদের আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

বাঘ গণনার চিত্র বদল

২০২৩-২৪ সালে পরিচালিত সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে; যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১১টি বেশি। সে হিসাবে ছয় বছরে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় বৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। বর্তমানে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব ২ দশমিক ৬৪টি।

একই জরিপে ২১টি বাঘ শাবকের ছবি ধরা পড়েছে, যেখানে ২০১৫ ও ২০১৮ সালের জরিপে মাত্র পাঁচটি করে শাবকের ছবি পাওয়া গিয়েছিল। বিভাগ জানায়, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী এসব শাবককে মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত শাবকদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

একসময় সুন্দরবনে বাঘ গণনার প্রধান উপায় ছিল কাদামাটিতে পায়ের ছাপ বা পাগমার্ক পর্যবেক্ষণ। একই বাঘের পায়ের ছাপ একাধিকবার গণনায় চলে আসার ঝুঁকি এবং অনেক এলাকায় স্পষ্ট ছাপ না পাওয়ায় সেই পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। বর্তমানে সেই পদ্ধতির পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্যামেরা ট্র্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ২০১৪ সাল থেকে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জকে প্রায় সাড়ে ছয়শ গ্রিডে ভাগ করে ২০০টিরও বেশি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। প্রায় ১০ লাখ ছবি বিশ্লেষণের পর প্রতিটি বাঘের শরীরের স্বতন্ত্র ডোরাকাটা নকশা শনাক্ত করে পৃথক প্রাণী হিসেবে গণনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন ভিন্ন, তেমনি প্রতিটি বাঘের শরীরের ডোরার নকশাও আলাদা। সেই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ শনাক্ত করা হয়েছে। ক্যামেরায় ১৯টি শাবকের উপস্থিতি মিললেও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেগুলো মূল গণনায় ধরা হয়নি। কারণ বনের প্রতিকূল পরিবেশে অনেক শাবক পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যায়।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

বাঘ সংরক্ষণে বন বিভাগ এখন ফুট পেট্রোলিং, ড্রোন নজরদারি এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনে ২৫টি অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।

এ ছাড়া বাঘের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে মল ও অন্যান্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঘের জন্য প্রাণঘাতী ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাসের উপস্থিতি থাকলেও সুন্দরবনের বাঘের মধ্যে এ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যা কিছুটা স্বস্তির খবর।

কমেছে মানুষ-বাঘ সংঘাত

বন বিভাগের তথ্যমতে, কয়েক বছর আগেও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় বাঘ ঢুকে পড়লে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা প্রায় ঘটত। ২০১৮ সালের পর থেকে এমন কোনো দাপ্তরিক ঘটনার তথ্য নেই।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুজ্জামান খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের রোপ ফেন্সিং, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম, কমিউনিটি পেট্রোল এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে মানুষ-বাঘ সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকদের মতে, সংঘাতের মূল কারণ এখনও বহাল রয়েছে। নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভাটার সময় বাঘ সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। বয়স বা অসুস্থতার কারণে শিকার ধরতে অক্ষম বাঘই সাধারণত গবাদিপশুর দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই নদী-খাল পুনঃখনন এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

খাদ্য নিরাপত্তার সংকট

সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণ ও বুনো শুকর। বন বিভাগের নিয়মিত অভিযানে প্রায় প্রতি সপ্তাহে উদ্ধার হচ্ছে হরিণ শিকারের হাজার হাজার মিটার নাইলনের ফাঁদ এবং বিপুল হরিণের মাংস।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মংলা ও শরণখোলাকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ চক্র এখনও সক্রিয়। স্থানীয় শিকারিরা ধরা পড়লেও তাদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব কম নেওয়া হয়। ফলে হরিণের সংখ্যা কমছে, পাশাপাশি এসব ফাঁদে আটকে আহত কিংবা নিহত হচ্ছে বাঘও।

সম্প্রতি হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করে ছয় মাস চিকিৎসা শেষে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। দেশের ইতিহাসে এটি প্রথম কোনো আহত বাঘকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা। কিন্তু অবমুক্তির পর তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ৪০টি ক্যামেরা বসানো হলেও বাঘিনীর কোনো সন্ধান মেলেনি। ফলে তার বেঁচে থাকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিকারিদের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এখন সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়মিত প্লাবিত হচ্ছে। এতে বাঘ ও হরিণের শাবক নিরাপদ আশ্রয় হারাচ্ছে। লোনা পানির কারণে উদ্ভিদের প্রজাতিগত পরিবর্তন ঘটছে, কমে যাচ্ছে হরিণের খাদ্য। পাশাপাশি বনজুড়ে মিঠাপানির উৎসও দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন বিভাগ বনের ভেতরে ২০টি কৃত্রিম উঁচু কিল্লা এবং ২০টি মিঠাপানির পুকুর তৈরি করেছে। ড্রোন নজরদারিতে দেখা গেছে, জলোচ্ছ্বাসের সময় কিছু বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী সেখানে আশ্রয় নিচ্ছে। তবে গবেষকদের মতে, প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সুন্দরবনের জন্য এই উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটিকে স্থায়ী সাফল্য বলা যাবে না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও চোরাশিকার–এই দুই সংকট এখনও সমানভাবে বিদ্যমান। খাদ্যশৃঙ্খল দুর্বল হলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ধরে রাখা কঠিন হবে।

রয়েছে চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কেবল নতুন প্রকল্পের ওপর নয়, বরং আইনের কার্যকর প্রয়োগের ওপর। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায় অনেক শিকারি গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়। ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামছে না।

বন গবেষকদের ভাষ্য, বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে ১২৫টি বাঘের খবর নিঃসন্দেহে দেশের জন্য গর্বের। এই সংখ্যা ধরে রাখার লড়াই এখন সবচেয়ে কঠিন পর্যায়ে। চোরাশিকার নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যপ্রাণী সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং বন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে কেবল কাগজের সাফল্য হয়েই থাকবে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ধীরে ধীরে হারাতে পারে তার সবচেয়ে গৌরবময় বাসিন্দা,রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, শুধু মোট বাঘের সংখ্যা জানালেই হবে না; বাঘ ও বাঘিনীর অনুপাতও প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন ও জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করে এই ভারসাম্যের ওপর। একই সঙ্গে কৃত্রিম কিল্লা ও মিঠাপানির পুকুর বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটিও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিষয় :খুলনা