রাজশাহী/৭ হাজার মানুষের চিকিৎসার ভরসা এক কমিউনিটি ক্লিনিক

রাজশাহীর পবা উপজেলার দুর্গম চর মাজারদিয়া। চারদিকে পদ্মা নদী। বর্ষায় উত্তাল স্রোত, আর শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ বালুচর। নদীর ওপারে রাজশাহী শহর খুব বেশি দূরে নয়। অথচ চরবাসীর কাছে জরুরি চিকিৎসা নিতে শহরে পৌঁছানো যেন দীর্ঘ এক যাত্রা। বিশেষ করে প্রসববেদনায় কাতর নারী, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি কিংবা মুমূর্ষু রোগীর জন্য পদ্মা পার হওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা।
চরটিতে প্রায় ৭ হাজার মানুষের বসবাস। একসময় জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার। পদ্মার ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বসতি হারিয়ে অনেকে অন্যত্র চলে গেলেও যারা রয়ে গেছেন, তাদের জীবনযুদ্ধ থামেনি। তবে বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবার সংকট তাদের নিত্যসঙ্গী।
সাধারণ অসুস্থতায় চরের কমিউনিটি ক্লিনিকই ভরসা। কিন্তু জটিল রোগ, দুর্ঘটনা, প্রসবকালীন জরুরি অবস্থা কিংবা রাতে গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে চিকিৎসার আগেই শুরু হয় নদী পারাপারের লড়াই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বর্ষাকালে নৌপথে পদ্মা পার হতে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এরপর সড়কপথে যেতে হয় পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা রাজশাহী শহরের হাসপাতালে। ফলে সংকটাপন্ন রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতেই কেটে যায় গুরুত্বপূর্ণ সময়। রাতে নৌযান পাওয়া, ঘাটে পৌঁছানো এবং উত্তাল নদী পার হওয়া—সব মিলিয়ে জরুরি রোগী নিয়ে স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় চরম উৎকণ্ঠা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চরবাসীর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকাজ করেই তাদের সংসার চলে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাদের বাড়তি নৌযান ও যাতায়াতের খরচ বহন করতে হয়। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে অর্থের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় সময়।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও প্রসূতিদের নিয়ে উদ্বেগ বেশি। প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন হলেও চরবাসীর ক্ষেত্রে প্রথমেই পার হতে হয় পদ্মা। নদী পার হওয়ার পর আবার সড়কপথে যেতে হয় হাসপাতালে। এতে জরুরি মুহূর্তে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চর মাজারদিয়ায় সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রিতেও চর মাজারদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার মতো অবকাঠামো সেখানে নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে শেষ পর্যন্ত নদী পেরিয়েই উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নিতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, সাধারণ অসুস্থতায় কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়া যায়। কিন্তু রোগী বেশি অসুস্থ হলে সেখানে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তখন নৌকা নিয়ে নদী পার হতে হয়। রাতে কোনো রোগী গুরুতর অসুস্থ হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
ওমর আলী বলেন, সন্তান প্রসবের সময় কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কয়েক মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাদের ক্ষেত্রে প্রথমেই পার হতে হয় নদী। এরপর আবার সড়কপথে হাসপাতালে যেতে হয়।
মো. মিজান আলী বলেন, চর থেকে রাজশাহী শহর খুব দূরে মনে হয় না। নদীর ওপারেই শহর দেখা যায়। কিন্তু অসুস্থ রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে অনেক সময় লাগে। বিশেষ করে বর্ষায় নদীর পানি ও স্রোত বেশি থাকলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
মমতা আফরোজা বলেন, গর্ভবতী নারী বা ছোট শিশু অসুস্থ হলে পরিবারের সবাই আতঙ্কে থাকেন। রাতে সমস্যা হলে কীভাবে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন। তাঁদের এখানে শুধু সাধারণ চিকিৎসা নয়, জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
চরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি নতুন নয়। চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে চর মাজারদিয়ায় বিনা মূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও সেখানে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদে মানুষ চিকিৎসাসেবা পেলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—নিয়মিত চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা কবে মিলবে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষায় পদ্মার পানি বাড়লে শুধু চিকিৎসাই নয়, পুরো যোগাযোগব্যবস্থাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমলেও বিশাল বালুচরের কারণে প্রত্যন্ত বসতি থেকে মূল সড়কে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা সারা বছরই স্বাস্থ্যসেবার বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
পবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ চিকিৎসাসেবায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে সেখানে বিশেষ চিকিৎসাসেবার আয়োজন করা হয়। ভবিষ্যতে আরও উন্নত চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করার কথা জানান তিনি।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর চরাঞ্চলগুলো বেশ অবহেলিত। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ চিকিৎসাসেবার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে চরবাসীকে আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।



