ধূমপান করেন না, তবুও ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে এই ৭ অভ্যাস

ধূমপান করেন না বলে অনেকেই মনে করেন, ফুসফুস নিয়ে আলাদা করে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু শুধু সিগারেট থেকে দূরে থাকলেই ফুসফুস পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে না। আমরা প্রতিদিন যে বাতাসে শ্বাস নিই, ঘরের পরিবেশ, কাজের ধরন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসও শ্বাসযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ, ধুলাবালু, ঘরের ভেতরের ধোঁয়া বা রাসায়নিকের সংস্পর্শের মতো বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা সবসময় সহজ নয়। এর সঙ্গে যদি শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা বা ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর পরিবেশকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার অভ্যাস যোগ হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এনডিটিভির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ফুসফুসের যত্নে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ কমানো, ঘরের বায়ু চলাচল বাড়ানো, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা মেনে চলা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘরের বাতাস চলাচল করতে না দেওয়া
সারাদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে থাকলে বাইরের ধুলো এড়ানো গেলেও ঘরের বাতাস সবসময় পরিষ্কার থাকে না। রান্নার ধোঁয়া, ধুলা, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং অন্যান্য দূষক ঘরের ভেতরে জমে থাকতে পারে।
তাই সম্ভব হলে ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। বিশেষ করে রান্নার সময় রান্নাঘরের ধোঁয়া বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
তবে বাইরে বায়ুদূষণ বেশি থাকলে নির্বিচারে জানালা খুলে দেওয়াও সমাধান নয়। বাতাসের মান বিবেচনা করে ঘরের বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা ভালো।
ধুলো ও দূষিত বাতাসকে গুরুত্ব না দেওয়া
রাস্তার ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণাগুলো শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকতে পারে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকা শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই রাস্তায় বা ধুলোময় পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকতে হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কর্মক্ষেত্রে ধুলো, ধোঁয়া বা রাসায়নিকের সংস্পর্শ থাকলে নির্ধারিত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ কমানো এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধি মেনে চলাকে ফুসফুস সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া এড়িয়ে না চলা
নিজে ধূমপান না করলেও আশপাশের মানুষের সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে। একে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপানের জন্য নিরাপদ কোনো মাত্রা নির্ধারিত নেই। ধূমপান না করা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর সংস্পর্শ ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, হাঁপানির সমস্যা এবং ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই বাড়ি, গাড়ি বা বন্ধ ঘরে কেউ ধূমপান করলে সেখান থেকে দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু জানালা খুলে দেওয়া বা অন্য ঘরে গিয়ে ধূমপান করলেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
দীর্ঘ সময় বসে থাকা
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা শুধু হৃদ্যন্ত্র বা ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে দিনের বড় অংশ এক জায়গায় বসে কাটানোর অভ্যাস শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়ায়। এনডিটিভির প্রতিবেদনে নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার ওপর ফুসফুসের স্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা বা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস করা ভালো।
কর্মক্ষেত্রে ধুলা ও রাসায়নিক থেকে সুরক্ষা না নেওয়া
কিছু পেশায় নিয়মিত ধুলা, ধোঁয়া, রাসায়নিক বা অন্যান্য বায়ুবাহিত পদার্থের সংস্পর্শে আসতে হয়। যেমন নির্মাণকাজ, কারখানা, খনি বা বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাজ।
এ ধরনের পরিবেশে দীর্ঘদিন কাজ করলে যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া এসব পদার্থ শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকতে পারে। তাই কর্মক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। এনডিটিভির প্রতিবেদনের মূল পরামর্শগুলোর মধ্যেও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা মেনে চলার বিষয়টি রয়েছে।
ঘরের দূষণের উৎসগুলোকে অবহেলা করা
শুধু বাইরের বায়ুদূষণ নয়, ঘরের ভেতরের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার ধোঁয়া, ধুলা, বিভিন্ন রাসায়নিকজাত পণ্য এবং ধোঁয়া তৈরি করে এমন উপাদান ঘরের বাতাসের মান খারাপ করতে পারে।
বিশেষ করে রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ধোঁয়া ও অন্যান্য কণা ঘরের ভেতরেই থেকে যেতে পারে। তাই রান্নার সময় যথাযথ বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং ঘর নিয়মিত পরিষ্কার রাখা দরকার।
শরীরচর্চা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা
ফুসফুস সুস্থ রাখতে শুধু দূষণ এড়িয়ে চলাই যথেষ্ট নয়। শরীরকে নিয়মিত সক্রিয় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য কোনো ব্যায়াম নিয়মিত করার অভ্যাস সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকা অবস্থায় বাইরে গিয়ে কঠোর ব্যায়াম করা সবসময় উপযুক্ত নাও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাতাসের মান বিবেচনা করে সময় ও স্থান বেছে নেওয়া ভালো। এনডিটিভিও দূষিত পরিবেশে শারীরিক সক্রিয়তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্ক থাকার কথা উল্লেখ করেছে।
ফুসফুস ভালো রাখতে আরও কী করবেন?
ফুসফুসের যত্নে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস কাজে লাগতে পারে-
- ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
- পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন
- অতিরিক্ত দূষিত বাতাসে অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় থাকবেন না
- ধুলোময় বা রাসায়নিকযুক্ত কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন
- ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন
- নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
- দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট বা বুকের অস্বস্তিকে অবহেলা করবেন না
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ধূমপান শ্বাসযন্ত্রের রোগ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ধূমপান না করলেও কাশি হলে কি চিন্তার কারণ?
সব কাশি ফুসফুসের গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। ঠান্ডা, অ্যালার্জি, সংক্রমণ বা পরিবেশগত কারণে সাময়িক কাশি হতে পারে।
তবে কাশি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে, বারবার শ্বাসকষ্ট হলে, বুক ব্যথা বা অস্বাভাবিক শ্বাসের সমস্যা দেখা দিলে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। ধূমপান না করলেও ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। তাই শুধু ধূমপান না করার কারণে দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ফুসফুসের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি শুধু ধূমপান না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই এবং প্রতিদিন যে পরিবেশে থাকি, সেগুলোরও গুরুত্ব রয়েছে।
পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা, দূষিত বাতাস ও ধুলার সংস্পর্শ কমানো, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা মেনে চলা, ঘরের বায়ু চলাচল ঠিক রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা ফুসফুসের যত্নে সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের কাশি বা শ্বাসকষ্টকে স্বাভাবিক ধরে না নেওয়া। ধূমপান না করলেও এমন উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: এনডিটিভি
