হাঁটলেই পায়ে ব্যথা হয়, এই লক্ষণ অবহেলা করবেন না

বয়স বাড়ার সঙ্গে পায়ে ব্যথা, ভারী লাগা বা হাঁটতে গিয়ে বারবার থেমে যাওয়াকে অনেকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। কেউ ভাবেন এটি বয়সের প্রভাব, কেউ আবার পেশিতে টান বা বাতের সমস্যা মনে করে বিষয়টি এড়িয়ে যান। কিন্তু হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় নিয়মিত পায়ে ব্যথা শুরু হয়ে বিশ্রাম নিলে তা কমে গেলে বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখা দরকার।
কারণ এমন ব্যথা কখনো পায়ের ধমনিতে রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। এই সমস্যাকে বলা হয় পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (Peripheral Artery Disease বা PAD)। এতে ধমনির ভেতরে চর্বি ও অন্যান্য পদার্থ জমে রক্তনালি সরু হয়ে যেতে পারে। ফলে হাঁটা বা ব্যায়ামের সময় পেশির প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। তখন পায়ে ব্যথা, টান বা ভারী লাগার মতো অনুভূতি হতে পারে।
শুধু পায়ের সমস্যা হিসেবে বিষয়টিকে দেখারও কারণ নেই। পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ পুরো শরীরের ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা ধমনিতে প্লাক জমার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এই রোগ থাকলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেশি হতে পারে।
হাঁটলেই পায়ে ব্যথা কেন হয়?
হাঁটা বা ব্যায়াম করার সময় পায়ের পেশিগুলোর বেশি রক্ত ও অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোনো ধমনি সরু বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পায়ে পৌঁছাতে পারে না।
ফলে হাঁটার কিছুক্ষণ পর পায়ের পেশিতে ব্যথা, টান, জ্বালাপোড়া, ভারী লাগা বা ক্লান্তির অনুভূতি হতে পারে। সাধারণত কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে এই অস্বস্তি কমে যায়। আবার হাঁটা শুরু করলে একই সমস্যা ফিরে আসতে পারে। এই ধরনের উপসর্গকে intermittent claudication বলা হয়।
ব্যথা সাধারণত পায়ের পেছনের পেশি বা কাফে বেশি অনুভূত হতে পারে। তবে উরু, নিতম্ব, গোড়ালি বা পায়ের অন্য অংশেও হতে পারে।
বয়সের কারণে হচ্ছে ভেবে ভুল করবেন না
বয়স বাড়ার সঙ্গে নানা ধরনের পায়ের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু হাঁটার সময় নিয়মিত পায়ে ব্যথা হওয়া এবং বিশ্রাম নিলে সেই ব্যথা কমে যাওয়াকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের কারণে হওয়া পায়ের ব্যথা অনেক সময় বয়স, বাত বা পেশির সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। অথচ এটি ধমনিতে রক্ত চলাচলের সমস্যার সংকেত হতে পারে।
তাই বিশেষ করে একই ধরনের ব্যথা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পায়ে ব্যথা ছাড়াও যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে: পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের ক্ষেত্রে শুধু হাঁটার সময় ব্যথাই নয়, পা ও পায়ের পাতায় আরও কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
পা বা পায়ের পাতা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া: এক পা অন্য পায়ের তুলনায় বেশি ঠান্ডা মনে হতে পারে। এর কারণ হতে পারে ওই পায়ে রক্ত চলাচল কমে যাওয়া।
ত্বকের রং বদলে যাওয়া: পায়ের ত্বক ফ্যাকাশে, নীলচে বা অন্য রকম রঙের হতে পারে। রক্ত চলাচল কমে গেলে এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
পায়ে অবশভাব বা দুর্বলতা: পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশ লাগা বা দুর্বল হয়ে যাওয়াও পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের সম্ভাব্য লক্ষণ। এতে হাঁটতে সমস্যা হতে পারে বা ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হতে পারে।
পায়ের লোম কমে যাওয়া: রক্ত চলাচল কমে গেলে পায়ের ত্বক ও লোমেও পরিবর্তন আসতে পারে। পায়ের লোমের বৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং পায়ের নখ ধীরে বাড়া PAD-এর সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া: পায়ে ছোট কোনো কাটা বা ক্ষত হওয়ার পর দীর্ঘদিনেও ভালো না হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের ক্ষেত্রে পায়ের ক্ষত ধীরে শুকাতে পারে বা সহজে না শুকাতেও পারে।
বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে কেন?
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের ক্ষেত্রে হাঁটার সময় পায়ের পেশির বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরু ধমনির কারণে তখন পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না। তাই ব্যথা বা অস্বস্তি শুরু হয়।
যখন হাঁটা বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া হয়, পেশির অক্সিজেনের প্রয়োজন কমে যায়। ফলে ব্যথাও ধীরে ধীরে কমতে পারে। আবার হাঁটা শুরু করলে প্রয়োজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা ফিরে আসতে পারে।
এই নির্দিষ্ট ধরনটি পায়ের ধমনিতে রক্ত চলাচলের সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু মানুষের পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে-
- ধূমপান করেন এমন ব্যক্তি
- ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
- উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তি
- রক্তে কোলেস্টেরল বেশি
- অতিরিক্ত ওজন রয়েছে
- হৃদ্রোগ রয়েছে
- কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে
- বয়স বাড়ছে
- পরিবারে ধমনির রোগের ইতিহাস রয়েছে
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ধূমপান ও ডায়াবেটিস পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পায়ের ধমনিতে ব্লক থাকলে কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?
পায়ের ধমনিতে ব্লক নিজে সরাসরি হার্ট অ্যাটাক ঘটায়, এমন নয়। তবে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ অনেক সময় শরীরের বিভিন্ন ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
একই ধরনের প্লাক যদি হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে তৈরি হয়, তাহলে করোনারি হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে সমস্যা হলে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এই কারণেই হাঁটার সময় নিয়মিত পায়ে ব্যথাকে শুধু পায়ের সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
অনেকের কোনো লক্ষণই থাকে না
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সবার ক্ষেত্রে স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ থাকা অনেক মানুষের উপসর্গ খুব কম হতে পারে, আবার কেউ কোনো লক্ষণই অনুভব নাও করতে পারেন।
তাই শুধু পায়ে ব্যথা নেই বলে ধমনিতে সমস্যা নেই, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, ধূমপান বা উচ্চ রক্তচাপের মতো ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের শনাক্ত করা হয়?
প্রথমে চিকিৎসক সাধারণত উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং রোগীর ঝুঁকির বিষয়গুলো মূল্যায়ন করেন। এরপর প্রয়োজন হলে রক্তনালিতে রক্ত চলাচল পরীক্ষা করা হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিটি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির মতো পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা ব্যক্তির উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
চিকিৎসা কি সম্ভব?
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের চিকিৎসা রোগের মাত্রা ও ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে।
ধূমপান বন্ধ করা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রক্তনালির রক্তপ্রবাহ ও রক্ত জমাটের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ওষুধও দেওয়া হয়।

ধমনি গুরুতরভাবে সরু বা বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসক অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট বা অন্য ধরনের চিকিৎসা বিবেচনা করতে পারেন।
তবে নিজের ইচ্ছায় ব্যায়াম বা কোনো ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিকল্পনা করা ভালো।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের কোনো লক্ষণ নিয়মিত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-
- হাঁটার সময় বারবার একই জায়গায় পায়ে ব্যথা হওয়া
- বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যাওয়া এবং আবার হাঁটলে ফিরে আসা
- পায়ে অবশভাব বা দুর্বলতা
- এক পা অন্যটির তুলনায় বেশি ঠান্ডা লাগা
- পায়ের ত্বকের রং বদলে যাওয়া
- পায়ে ক্ষত হয়ে দীর্ঘদিনেও না শুকানো
- পায়ের লোম বা নখের বৃদ্ধিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও পায়ে ব্যথা হওয়া
বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা ধূমপানের ইতিহাস থাকলে এসব লক্ষণকে অবহেলা না করাই ভালো।
হাঁটার সময় পায়ে ব্যথা হওয়া সবসময় ধমনিতে ব্লকের লক্ষণ নয়। পেশির সমস্যা, জয়েন্টের সমস্যা বা অন্য কারণেও পায়ে ব্যথা হতে পারে। তবে হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় নিয়মিত ব্যথা শুরু হয়ে বিশ্রাম নিলে কমে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
কারণ এটি পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের লক্ষণ হতে পারে। এই রোগ শুধু পায়ের রক্ত চলাচলকেই প্রভাবিত করে না, শরীরের সামগ্রিক ধমনির স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
তাই পায়ে এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তন বারবার দেখা দিলে বয়সের স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে বসে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
