logo

মুখের ঘা ২ সপ্তাহেও সারছে না, কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন

মুখের ঘা ২ সপ্তাহেও সারছে না, কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন
কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মুখের ঘা মুখের ক্যানসারেরও প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

মুখের ভেতরে ছোট একটি ঘা হওয়া খুবই সাধারণ। ঝাল খাবার খাওয়া, মুখের ভেতর কামড়ে যাওয়া, দাঁতের ধারালো অংশে ঘষা লাগা, মানসিক চাপ বা কিছু পুষ্টির ঘাটতির কারণেও মুখে ঘা হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘা কয়েক দিন থেকে এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।

তবে ঘা হওয়ার পর অনেক দিন কেটে গেলেও যদি সেটি না শুকায়, বারবার একই জায়গায় হয় বা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ দীর্ঘদিন না শুকানো মুখের ঘা কখনো কখনো মুখের ক্যানসারের একটি লক্ষণও হতে পারে। তবে শুধু মুখে ঘা হয়েছে বলেই ক্যানসার হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

মুখের সাধারণ ঘা কত দিনে সারে?

সাধারণ মুখের ঘা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। মুখের ভেতরে কামড় লাগা, শক্ত খাবারে আঘাত পাওয়া, খুব গরম খাবার বা পানীয়তে পুড়ে যাওয়া, কিছু ধরনের টুথপেস্ট, মানসিক চাপ এবং কিছু ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতিও মুখের ঘার কারণ হতে পারে।

তাই একবার মুখে ঘা হলেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে সময়ের সঙ্গে ঘা কমার বদলে যদি একই রকম থাকে বা আরও খারাপ হয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

দুই সপ্তাহ ধরে ঘা থাকলে কী করবেন?

এখানে সময় নিয়ে কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার। NHS-এর তথ্য অনুযায়ী, দুই সপ্তাহ ধরে মুখের ঘা না শুকালে বা আরও খারাপ হলে ডেন্টাল চিকিৎসার পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। আর সাধারণভাবে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী মুখের ঘা অবশ্যই চিকিৎসক বা দন্ত চিকিৎসককে দেখানো উচিত।

অর্থাৎ দুই সপ্তাহ হলেই ক্যানসার, এমন কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। কিন্তু ঘা দীর্ঘস্থায়ী হলে অপেক্ষা না করে পরীক্ষা করানো ভালো।

দীর্ঘদিনের মুখের ঘা কি মুখের ক্যানসারের লক্ষণ?

হতে পারে, তবে এটি কেবল একটি সম্ভাব্য লক্ষণ।

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, মুখ বা ঠোঁটে দীর্ঘদিন না শুকানো ঘা মুখের ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর একটি। এর সঙ্গে মুখে ব্যথা, কোনো অংশ মোটা বা শক্ত হয়ে যাওয়া, সাদা বা লাল দাগ, গিলতে বা চিবাতে সমস্যা, মুখের কোনো অংশ অবশ হয়ে যাওয়া এবং ঘাড়ে গুটি দেখা দিতে পারে।

তবে একই ধরনের উপসর্গ অন্য অনেক রোগ বা সাধারণ সমস্যার কারণেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে ক্যানসার নির্ণয় করা যায় না।

মুখের ঘা ক্যানসারের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে, যদি সঙ্গে থাকে এসব লক্ষণ

ঘা শুকাচ্ছে না: সাধারণ ঘা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু ঘা একই জায়গায় থেকে গেলে বা কয়েক সপ্তাহেও না শুকালে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ঘা বারবার রক্তপাত করছে: মুখের ঘা যদি সহজে রক্তপাত করে বা বারবার রক্ত বের হয়, সেটি পরীক্ষা করানো উচিত। বিশেষ করে অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মুখে সাদা বা লাল দাগ দেখা দিয়েছে: মুখের ভেতরে এমন সাদা বা লাল দাগ দেখা দিলে, যা সহজে সরে যাচ্ছে না, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এগুলো মুখের ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

মুখের ভেতরে গুটি বা শক্ত অংশ তৈরি হয়েছে: ঘার আশপাশে কোনো গুটি, ফোলা বা অস্বাভাবিকভাবে শক্ত হয়ে যাওয়া অংশ থাকলে সেটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ঠোঁট, গাল বা মুখের অন্য অংশেও এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

চিবাতে বা গিলতে সমস্যা হচ্ছে: মুখের ঘার সঙ্গে যদি খাবার চিবানো বা গিলতে অসুবিধা হয়, কিংবা গিলতে ব্যথা করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কথা বলায় পরিবর্তন এসেছে: মুখের কোনো সমস্যার সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধা হওয়া বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলেও বিষয়টি পরীক্ষা করা দরকার।

মুখ বা জিহ্বার কোনো অংশ অবশ লাগছে: জিহ্বা, ঠোঁট বা মুখের কোনো অংশে অস্বাভাবিক অবশভাব থাকলে সেটিকে সাধারণ ঘা বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া বা আগের দাঁতের সেটিংয়ে পরিবর্তন আসাও মুখের ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি কার বেশি?

মুখের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে তামাকের ব্যবহার ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। ধূমপান বা তামাক চিবানোর পাশাপাশি অ্যালকোহল গ্রহণ করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সুপারি বা পানজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহারও মুখের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা HPV সংক্রমণ, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অন্যান্য কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ঝুঁকির কারণ থাকা মানেই কারও মুখের ক্যানসার হবে, এমন নয়। আবার এসব ঝুঁকি না থাকলেও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে তা পরীক্ষা করানো দরকার।

সাধারণ মুখের ঘা হওয়ার কারণ কী?

মুখের ঘা অনেক সাধারণ কারণেই হতে পারে। যেমন-

  • মুখের ভেতরে কামড় লেগে যাওয়া
  • ধারালো দাঁত বা দাঁতের ফিলিংয়ে ঘষা লাগা
  • ব্রেস বা ঠিকমতো না বসা ডেনচারের কারণে আঘাত
  • খুব গরম খাবার বা পানীয়তে মুখ পুড়ে যাওয়া
  • ঝাল, টক বা অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবারে জ্বালা
  • মানসিক চাপ ও ক্লান্তি
  • কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি
  • কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
  • কিছু শারীরিক বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা-সংক্রান্ত সমস্যা

তাই মুখে ঘা হলেই ক্যানসারের কথা ভাবার প্রয়োজন নেই।

ঘা হলে ঘরেই কী করতে পারেন?

সাধারণ মুখের ঘা হলে মুখ পরিষ্কার রাখা এবং যে বিষয়গুলো ঘাকে আরও জ্বালাপোড়া করায় সেগুলো এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।

নরম ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন। অতিরিক্ত ঝাল, টক, লবণাক্ত ও খুব গরম খাবার কিছুদিন এড়িয়ে চলুন। শক্ত বা কুড়মুড়ে খাবারও ঘায়ে ঘষা লাগিয়ে সমস্যা বাড়াতে পারে।

হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলি করাও করা যায়। তবে ঘা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মুখের ঘা পরীক্ষা করতে কার কাছে যাবেন?

প্রথমে দন্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন। তারা মুখের ভেতর ঘা, দাগ, গুটি বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন পরীক্ষা করবেন। প্রয়োজন হলে আরও পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন।

মুখের ক্যানসার নিশ্চিত করার জন্য শুধু ঘা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন এবং সন্দেহজনক টিস্যু পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।

কখন একেবারেই দেরি করবেন না?

মুখের ঘা কয়েক সপ্তাহেও না শুকালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে ঘার সঙ্গে যদি গুটি, সাদা বা লাল দাগ, রক্তপাত, অবশভাব, গিলতে সমস্যা, চিবাতে সমস্যা, কথা বলার সমস্যা বা ঘাড়ে গুটি থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

যাদের তামাক বা সুপারি ব্যবহারের অভ্যাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মুখের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তন হলে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

মুখের ঘা খুব সাধারণ সমস্যা এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি গুরুতর কিছু নয়। সাধারণ ঘা সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু ঘা দীর্ঘদিন ধরে না শুকালে, বড় হলে, বারবার রক্তপাত করলে বা এর সঙ্গে মুখে সাদা বা লাল দাগ, গুটি, অবশভাব কিংবা গিলতে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুখের ঘা দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। আবার দীর্ঘস্থায়ী ঘাকে অবহেলাও করা উচিত নয়। কারণ থাকলে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ পথ।

সূত্র: নিউজ ১৮