logo

ডিমের কুসুম খেলে কি হার্টের ঝুঁকি বাড়ে? যা বলছে গবেষণা

ডিমের কুসুম খেলে কি হার্টের ঝুঁকি বাড়ে? যা বলছে গবেষণা
ছবি: টেস্ট অব হোম

ডিম আমাদের প্রতিদিনের খাবারের পরিচিত একটি অংশ। প্রোটিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস হওয়ায় অনেকের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত থাকে ডিম। তবে ডিম নিয়ে একটি পুরোনো প্রশ্ন এখনও অনেকের মনে রয়েছে, ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল বেশি, তাহলে এটি কি হৃদ্‌রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়?

একসময় হৃদ্‌রোগের আশঙ্কায় ডিমের কুসুম কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো। তবে পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরলকে হৃদ্‌রোগের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাবারের সামগ্রিক ধরন, বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ, শরীরের ওজন, রক্তের এলডিএল কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে ডিমের কুসুম কি পুরোপুরি নিরাপদ? উত্তরটি এতটা সরল নয়।

ডিমে কী কী পুষ্টি আছে?

একটি ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ থাকে। ডিমের সাদা অংশে মূলত প্রোটিন বেশি থাকলেও কুসুমেও গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি রয়েছে।

কুসুমে কোলিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। কোলিন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান।

এ ছাড়া কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিনের মতো ক্যারোটিনয়েড থাকে, যা চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই শুধু কুসুমে কোলেস্টেরল আছে বলে ডিমের এই অংশে থাকা অন্যান্য পুষ্টি উপাদানকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।

ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল কতটা?

একটি বড় ডিমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল থাকতে পারে। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক জিনিস নয়। শরীর নিজেও কোলেস্টেরল তৈরি করে।

এ ছাড়া একজন মানুষ কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন, বিশেষ করে তার খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট কতটা রয়েছে, সেটিও রক্তের এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার ফল একেবারে একমুখী নয়।

তাহলে কি কুসুম খেলে হার্ট অ্যাটাক হয়?

শুধু ডিমের কুসুম খাওয়াকে হার্ট অ্যাটাকের সরাসরি কারণ বলা যায় না। সুস্থ মানুষের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে প্রতিদিন একটি পুরো ডিম রাখা যেতে পারে বলে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি বা ডিসলিপিডেমিয়া রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ডিমসহ খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

women's heart attack_
ছবি :

অর্থাৎ, ডিমের কুসুমকে একেবারে নিষিদ্ধ খাবার হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। আবার বেশি ডিম খেলেও সমস্যা হবে না, এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না।

আসল বিষয় হলো পুরো খাদ্যতালিকা

ধরা যাক, কেউ ডিম খাচ্ছেন কিন্তু একই সঙ্গে নিয়মিত বাটার, চর্বিযুক্ত মাংস, সসেজ, বেকন, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবারও খাচ্ছেন। তার খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক প্রভাব শুধু ডিম খাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও একটি নির্দিষ্ট খাবারের বদলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেয়। শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও কম স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

যাদের কোলেস্টেরল বেশি, তারা কী করবেন?

রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি থাকলে বিষয়টি একটু আলাদাভাবে দেখতে হবে। এলডিএল বেশি হলে ধমনিতে প্লাক জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

তাই যাদের উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি রয়েছে, তারা প্রতিদিন কতটি পুরো ডিম খাবেন তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করাই ভালো।

বিশেষ করে আগে থেকেই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ওষুধ খেলে বা চিকিৎসক খাদ্যতালিকায় পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকলে নিজের ইচ্ছায় ডিমের পরিমাণ বাড়ানো ঠিক নয়।

দিনে কয়টি ডিম খাওয়া উচিত?

সবার জন্য একই সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। বয়স, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, রক্তের কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বিবেচনা করে পরিমাণ ঠিক করা উচিত।

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি পুরো ডিম স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। কেউ নিয়মিতভাবে এর চেয়ে বেশি ডিম খেতে চাইলে নিজের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শুধু বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন বলে প্রতিদিন তিন বা চারটি পুরো ডিম খাওয়া সবার জন্য উপযুক্ত, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

দেশি ডিম না পোলট্রির ডিম?

দেশি বা ফ্রি-রেঞ্জ মুরগির ডিম এবং পোলট্রি মুরগির ডিম নিয়ে অনেক ধরনের ধারণা রয়েছে। মুরগির খাবার ও পালনের পদ্ধতির কারণে কুসুমের রং বা কিছু পুষ্টি উপাদানের পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে।

তবে শুধু কুসুমের গাঢ় রং দেখেই একটি ডিমকে অনেক বেশি পুষ্টিকর বা স্বাস্থ্যকর বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডিমের পুষ্টিমান বিচার করতে সামগ্রিক খাদ্যমান ও উৎপাদন পদ্ধতিও বিবেচনায় নিতে হয়।

ডিম খেলে গ্যাস হয়?

ডিম খেলে সবার গ্যাস হবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। তবে কিছু মানুষের নির্দিষ্ট খাবার খেলে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। ডিম খাওয়ার পর নিয়মিত এমন সমস্যা হলে খাবারের পরিমাণ, রান্নার ধরন বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

কাঁচা ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?

কাঁচা বা কম সিদ্ধ ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাজা ও দেখতে পরিষ্কার ডিমেও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে ডায়রিয়া, জ্বর, পেটব্যথা ও বমির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।

eggs (1)

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তাই ডিম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াই নিরাপদ।

ডিম নিয়ে শেষ কথা

ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকলেও শুধু এ কারণে সেটিকে হৃদ্‌রোগের জন্য ক্ষতিকর খাবার হিসেবে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে ডিম যত বেশি খাওয়া হবে তত ভালো, এমন ধারণাও ঠিক নয়।

আপনি কতটা ডিম খাবেন, সেটি নির্ভর করবে আপনার বয়স, খাদ্যাভ্যাস, রক্তের কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।

বিশেষ করে যাদের কোলেস্টেরল বেশি, হৃদ্‌রোগ রয়েছে বা ডায়াবেটিস আছে, তারা নিয়মিত বেশি পরিমাণে পুরো ডিম খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা