চোখ কি হার্ট অ্যাটাকের আগাম সংকেত দিতে পারে
-412cff-720x405.webp)
চোখকে আমরা সাধারণত দৃষ্টিশক্তির অঙ্গ হিসেবেই দেখি। চোখে ঝাপসা দেখা, চোখের চাপ বা রেটিনার সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা ভাবি। কিন্তু চোখের ভেতরের একটি অংশ শরীরের আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যও দিতে পারে। সেটি হলো রেটিনা।
রেটিনার ভেতর দিয়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি চলে গেছে। শরীরের অন্য অনেক জায়গার তুলনায় এসব রক্তনালি সরাসরি এবং তুলনামূলক সহজে দেখা যায়। এ কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে রেটিনার রক্তনালির পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রেটিনার কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে হৃদ্রোগ ও করোনারি হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চোখের দিকে তাকিয়েই বোঝা যাবে কার কখন হার্ট অ্যাটাক হবে। বরং রেটিনা পরীক্ষা ভবিষ্যতে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বোঝার একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
রেটিনা কেন হৃদ্রোগের তথ্য দিতে পারে?
রেটিনা হলো চোখের পেছনের আলো-সংবেদনশীল স্তর। এর ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র ধমনিকা ও শিরাগুলো শরীরের সূক্ষ্ম রক্তনালির স্বাস্থ্যের একটি দৃশ্যমান চিত্র দেয়।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘদিনের প্রদাহ এবং অন্যান্য রক্তনালির সমস্যার প্রভাব চোখের এই ক্ষুদ্র রক্তনালিতেও দেখা যেতে পারে। গবেষণায় রেটিনার রক্তনালির আকার, সরু বা প্রশস্ত হওয়া এবং অন্যান্য পরিবর্তনের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এ কারণেই রেটিনাকে শরীরের রক্তনালির স্বাস্থ্যের একটি জানালা হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
রেটিনা স্ক্যানে কী কী পরিবর্তন দেখা যেতে পারে?
চোখের পরীক্ষা বা রেটিনার ছবি বিশ্লেষণের সময় চিকিৎসকেরা বিভিন্ন ধরনের রক্তনালির পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে পারেন।
রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়া
রেটিনার ছোট ধমনিগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় সরু দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপসহ কিছু রক্তনালির সমস্যার সঙ্গে এ ধরনের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় রেটিনার সরু ধমনির সঙ্গে করোনারি হৃদ্রোগের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে রেটিনার বিভিন্ন ক্ষুদ্র রক্তনালির পরিবর্তনের সঙ্গে পরবর্তীতে করোনারি হৃদ্রোগ হওয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়।
ধমনি ও শিরার সংযোগস্থলে পরিবর্তন
রেটিনার ধমনি ও শিরা যেখানে একে অপরকে অতিক্রম করে, সেখানে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে এভি নিকিং বলা হয়।
এ ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ক্ষুদ্র রক্তক্ষরণ বা রক্তনালির ক্ষতির চিহ্ন
রেটিনায় ছোট রক্তক্ষরণ বা রক্তনালির ক্ষতির কিছু চিহ্ন দেখা গেলে তা শরীরের রক্তনালির সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে এসব লক্ষণের কারণ একাধিক হতে পারে। তাই শুধু রেটিনার একটি পরিবর্তন দেখে হৃদ্রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
কোলেস্টেরলের ক্ষুদ্র জমাট
কিছু ক্ষেত্রে চোখের রেটিনার রক্তনালিতে উজ্জ্বল ছোট কোলেস্টেরলজাত পদার্থ দেখা যেতে পারে। এগুলোকে হোলেনহর্স্ট প্লাক বলা হয়। এ ধরনের চিহ্ন দেখা গেলে চিকিৎসকেরা শরীরের রক্তনালির অবস্থা আরও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
তাহলে কি রেটিনা স্ক্যান দিয়ে হার্ট অ্যাটাকের আগেই জানা সম্ভব?
এখানেই বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বোঝা জরুরি।
রেটিনার পরিবর্তন এবং হৃদ্রোগের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রেটিনা স্ক্যানকে এখনো হার্ট অ্যাটাকের নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়ার একক পরীক্ষা হিসেবে ধরা যায় না।
২০২৪ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় ২১টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালির বিভিন্ন পরিবর্তনের সঙ্গে করোনারি হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়। গবেষকেরা বলেছেন, রেটিনার রক্তনালি পরীক্ষা ভবিষ্যতে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ শনাক্ত করার সহায়ক পদ্ধতি হতে পারে।
আরেকটি গবেষণা পর্যালোচনায় রেটিনার রক্তনালির পরিবর্তনের সঙ্গে করোনারি রোগ, হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা, স্ট্রোক এবং অন্যান্য হৃদ্রোগের সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ রেটিনা থেকে পাওয়া তথ্য ঝুঁকি বোঝাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটি প্রচলিত হৃদ্রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের বিকল্প নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে সাহায্য করতে পারে?
এই জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে গবেষণা বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।
রেটিনার ছবি বিশ্লেষণ করে রক্তনালির প্রস্থ, বাঁক, শাখা-প্রশাখার ধরনসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব। এআই ব্যবহার করে এসব বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে মানুষের চোখে সহজে ধরা না পড়া কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তনও শনাক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই প্রযুক্তি এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় সম্ভাবনাময় ফল পাওয়া গেলেও নিয়মিত হৃদ্রোগ নির্ণয়ের কাজে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।
চোখের পরীক্ষা করালে কি হৃদ্রোগের পরীক্ষাও হয়ে যায়?
না। চোখের সাধারণ পরীক্ষা থেকে রেটিনার রক্তনালির কিছু পরিবর্তন ধরা পড়তে পারে। কিন্তু এতে হৃদ্রোগের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা হয়ে যায় না।
কারও রেটিনায় উচ্চ রক্তচাপ বা ক্ষুদ্র রক্তনালির পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া গেলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, পারিবারিক ইতিহাস, ধূমপানের অভ্যাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করতে পারেন। এরপর প্রয়োজন হলে হৃদ্রোগের আরও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
কারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন?
যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বেশি কোলেস্টেরল, ধূমপানের অভ্যাস বা পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
চোখের পরীক্ষায় রেটিনার রক্তনালিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়লে সেটিকে শুধু চোখের সমস্যা হিসেবে না দেখে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে একাধিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হলে চোখের পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা নয়
রেটিনা নিয়ে গবেষণা যতই আশাব্যঞ্জক হোক, কারও বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ার মতো হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে রেটিনা স্ক্যানের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
চোখ শুধু দেখার জন্য নয়, শরীরের ভেতরের রক্তনালির স্বাস্থ্য সম্পর্কেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালির আকার ও গঠনের পরিবর্তনের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে এখন বেশ কিছু গবেষণা রয়েছে।
ভবিষ্যতে রেটিনা স্ক্যান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হৃদ্রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বর্তমানে এটিকে সহায়ক পরীক্ষা হিসেবেই দেখা বেশি যুক্তিসংগত। হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও জীবনযাপনের মতো প্রচলিত বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনডিটিভি
