logo
Advertisement

রক্তের ক্যানসারের শুরুতে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
রক্তের ক্যানসারের শুরুতে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
ছবি: এনডিটিভি

ক্লান্তি, বারবার জ্বর, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা শরীরে সহজে কালশিটে পড়া। এসব লক্ষণকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অনেকেই এড়িয়ে যান। অথচ কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের উপসর্গ রক্তের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। রক্তের ক্যানসার বলতে একটি নির্দিষ্ট রোগকে বোঝায় না। রক্ত তৈরি হয় এমন টিস্যু, অস্থিমজ্জা বা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কোষ থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ক্যানসারকে সাধারণভাবে রক্তের ক্যানসার বলা হয়। এর প্রধান ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা এবং মাল্টিপল মায়েলোমা।

তাই কোনো একটি উপসর্গ দেখেই রক্তের ক্যানসার হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষণ থাকলে সেটিকে অবহেলাও করা উচিত নয়।

রক্তের ক্যানসার কী?

আমাদের অস্থিমজ্জায় রক্তের বিভিন্ন কোষ তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লেটলেট। লিউকেমিয়ার মতো ক্যানসারে অস্বাভাবিক রক্তকণিকা তৈরি হয়ে স্বাভাবিক কোষের জায়গা দখল করতে পারে। এর ফলে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন, সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই এবং রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

লিম্ফোমা মূলত লিম্ফোসাইট নামের শ্বেত রক্তকণিকা থেকে শুরু হয়। অস্বাভাবিক লিম্ফোসাইট লিম্ফ নোড, লিম্ফনালি বা শরীরের অন্য অংশে জমতে পারে।

অন্যদিকে মাল্টিপল মায়েলোমা অস্থিমজ্জার প্লাজমা কোষকে আক্রান্ত করে। এই রোগে অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ বেড়ে গিয়ে সুস্থ রক্তকণিকা তৈরিতে বাধা দিতে পারে এবং হাড় ও কিডনিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রক্তের ক্যানসারের প্রধান ধরন

লিউকেমিয়া

লিউকেমিয়া অস্থিমজ্জার রক্ত তৈরির টিস্যু থেকে শুরু হয়। এটি দ্রুত বাড়তে পারে বা ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে পারে। আবার কোন ধরনের রক্তকণিকা আক্রান্ত হচ্ছে, তার ওপরও লিউকেমিয়ার ধরন নির্ভর করে।

প্রধান চার ধরনের লিউকেমিয়া হলো-

  • অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া বা ALL
  • অ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া বা AML
  • ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া বা CLL
  • ক্রনিক মাইলয়েড লিউকেমিয়া বা CML

তীব্র বা অ্যাকিউট ধরনের লিউকেমিয়া সাধারণত দ্রুত অগ্রসর হয়। ক্রনিক ধরনের লিউকেমিয়া তুলনামূলক ধীরে বাড়ে।

লিম্ফোমা

লিম্ফোমা লিম্ফোসাইট থেকে তৈরি হওয়া ক্যানসার। এর দুটি বড় শ্রেণি হলো হজকিন লিম্ফোমা এবং নন-হজকিন লিম্ফোমা।

নন-হজকিন লিম্ফোমার ক্ষেত্রে ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে ব্যথাহীন গুটি বা লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। এর সঙ্গে রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, চুলকানি বা অকারণে ওজন কমার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

মাল্টিপল মায়েলোমা

মায়েলোমা অস্থিমজ্জার প্লাজমা কোষের ক্যানসার। এই রোগে হাড়ে ব্যথা, বিশেষ করে পিঠ, কোমর, কাঁধ বা পাঁজরে ব্যথা হতে পারে। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, পেশির দুর্বলতা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং অকারণে ওজন কমে যাওয়াও দেখা দিতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে এবং অন্য কারণে রক্ত পরীক্ষা করতে গিয়ে রোগটি ধরা পড়তে পারে।

কোন লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে

রক্তের ক্যানসারের লক্ষণ রোগের ধরন ও কোন পর্যায়ে ধরা পড়ছে তার ওপর নির্ভর করে। সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো-

অস্বাভাবিক ক্লান্তি: বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ক্লান্তি থাকে, তার অনেক কারণ থাকতে পারে। রক্তের ক্যানসারে স্বাভাবিক রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে অ্যানিমিয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ক্লান্তির কারণ হতে পারে।

বারবার জ্বর বা সংক্রমণ: স্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বা কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে বারবার সংক্রমণ বা অকারণে জ্বর দেখা দিতে পারে।

সহজে কালশিটে বা রক্তপাত: প্লেটলেটের সংখ্যা কমে গেলে অল্প আঘাতেই কালশিটে পড়া, নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা সহজে রক্তপাত হতে পারে।

অকারণে ওজন কমা: খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক পরিশ্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকা সত্ত্বেও ওজন কমে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তবে এই লক্ষণের অনেক সাধারণ কারণও থাকতে পারে।

লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া: ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে ব্যথাহীন গুটি বা ফোলা লিম্ফোমার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। তবে সংক্রমণসহ আরও অনেক কারণেও লিম্ফ নোড ফুলে যেতে পারে।

রাতে অতিরিক্ত ঘাম: বিশেষ করে ঘরের পরিবেশের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি রাতের ঘাম হলে এবং এর সঙ্গে অন্য লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

হাড়ে ব্যথা: মাল্টিপল মায়েলোমার ক্ষেত্রে পিঠ, পাঁজর, কোমর বা অন্যান্য হাড়ে ব্যথা দেখা দিতে পারে।

এসব লক্ষণ মানেই কি রক্তের ক্যানসার?

একেবারেই না। ক্লান্তি, জ্বর, ওজন কমা, ঘাম, কালশিটে বা লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া অনেক সাধারণ রোগেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে রক্তের ক্যানসার শনাক্ত করা যায় না।

ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটও বলছে, ক্যানসারের সম্ভাব্য অনেক উপসর্গ আসলে অন্যান্য অসুস্থতা, আঘাত বা সাধারণ সমস্যার কারণেও হতে পারে। তবে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে রক্তের ক্যানসার শনাক্ত করা হয়?

রোগের ধরন অনুযায়ী পরীক্ষার প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।

এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা হয়। রক্তের বিভিন্ন কোষের সংখ্যা ও গঠন পরীক্ষা করে অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

কিছু ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা পরীক্ষা, লিম্ফ নোডের বায়োপসি, ইমেজিং পরীক্ষা বা অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। কোন পরীক্ষা করা হবে তা নির্ভর করে সন্দেহ করা রোগের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর।


রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসা কি সম্ভব?

রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসা রোগের ধরন, পর্যায়, রোগীর বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসায় রোগের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে-

  • কেমোথেরাপি
  • টার্গেটেড থেরাপি
  • ইমিউনোথেরাপি
  • রেডিওথেরাপি
  • স্টেম সেল বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট
  • কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও সহায়ক চিকিৎসা

সব রোগীর জন্য একই চিকিৎসা দেওয়া হয় না। যেমন কিছু ধরনের মায়েলোমায় উপসর্গ না থাকলে শুরুতেই চিকিৎসা প্রয়োজন নাও হতে পারে। আবার রোগ সক্রিয় হলে কেমোথেরাপি, টার্গেটেড ওষুধ, স্টেরয়েড বা স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের মতো চিকিৎসা বিবেচনা করা হতে পারে।

রক্তের ক্যানসার কি পুরোপুরি ভালো হয়?

এর একটি নির্দিষ্ট উত্তর নেই।

কিছু রক্তের ক্যানসার চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রেমিশন সম্ভব হয় এবং কিছু রোগ দীর্ঘমেয়াদি অবস্থায় পরিণত হতে পারে। রোগের ধরনভেদে চিকিৎসার ফলও আলাদা।

উদাহরণ হিসেবে, মাল্টিপল মায়েলোমা সাধারণত পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং রোগীর আয়ু ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।

তাই রক্তের ক্যানসার মানেই চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই, এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি সব ধরনের রক্তের ক্যানসার একইভাবে নিরাময়যোগ্য, এমন ধারণাও ঠিক নয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

অকারণে দীর্ঘদিন ক্লান্তি, বারবার জ্বর বা সংক্রমণ, সহজে কালশিটে পড়া বা রক্তপাত, অকারণে ওজন কমা, দীর্ঘদিনের হাড়ের ব্যথা, রাতে অতিরিক্ত ঘাম কিংবা ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে ব্যথাহীন গুটি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বিশেষ করে এসব লক্ষণ কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে নিজে থেকে কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ দ্রুত পরীক্ষা করলে ক্যানসার থাকলে সেটি শনাক্ত করার পাশাপাশি ক্যানসার না থাকলেও অন্য কোনো সমস্যার সঠিক কারণ খুঁজে চিকিৎসা শুরু করা যায়।

রক্তের ক্যানসার একটি একক রোগ নয়। লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ও মায়েলোমাসহ বিভিন্ন রোগকে এর আওতায় ধরা হয়। তাই লক্ষণ, চিকিৎসা এবং রোগের ফলাফলও একেক ক্ষেত্রে একেক রকম।

অকারণে ক্লান্তি, জ্বর, ওজন কমে যাওয়া বা শরীরে গুটি দেখা দিলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ একই উপসর্গ সাধারণ অসুস্থতার কারণেও হতে পারে, আবার কোনো ক্ষেত্রে গুরুতর রোগের ইঙ্গিতও হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি