চোখের পাওয়ার মিলে গেলেই কি অন্যের চশমা পরা যাবে

সকালে তাড়াহুড়োয় নিজের চশমা বাড়িতে রেখে বেরিয়ে গেছেন। পাশে থাকা বন্ধুর চশমার পাওয়ারও আপনার মতো। তাই ভাবলেন, আপাতত সেটিই পরে নেওয়া যাক। আবার কারও চশমা পরে দেখলেন, বেশ পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি একই পাওয়ার হলে অন্যের চশমা পরতে কোনো সমস্যা নেই?
বিষয়টি এতটা সহজ নয়। চশমার লেন্সের পাওয়ার একই হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই সব নয়। দুই চোখের মণির দূরত্ব, সিলিন্ড্রিক্যাল পাওয়ার ও অ্যাক্সিস, লেন্সের অপটিক্যাল সেন্টার এবং ফ্রেমের মাপও দৃষ্টির স্বচ্ছতা ও আরামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে একই পাওয়ারের চশমাও একজনের চোখে আরামদায়ক হলেও অন্যের চোখে অস্বস্তিকর হতে পারে।
শুধু পাওয়ার মিললেই কেন সব ঠিক হয় না?
চশমার প্রেসক্রিপশনে শুধু মাইনাস বা প্লাস পাওয়ার থাকে না। অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাস্টিগম্যাটিজম ঠিক করার জন্য সিলিন্ড্রিক্যাল পাওয়ার ও অ্যাক্সিসও প্রয়োজন হয়। দুই ব্যক্তির স্ফেরিক্যাল পাওয়ার একই হলেও এই মাপগুলো আলাদা হতে পারে।
ফলে অন্যের চশমা পরে কিছুটা পরিষ্কার দেখা গেলেও দীর্ঘ সময় ব্যবহারের ক্ষেত্রে চোখে অস্বস্তি হতে পারে। লেখা বা চারপাশের জিনিস সামান্য ঝাপসা বা বিকৃত লাগতে পারে।
দুই চোখের মণির দূরত্বও গুরুত্বপূর্ণ
চশমা তৈরির সময় দুই চোখের মণির মধ্যকার দূরত্ব, যাকে পিউপিলারি ডিস্ট্যান্স বলা হয়, বিবেচনা করা হয়। লেন্সের যে অংশ দিয়ে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, সেটি চোখের অবস্থানের সঙ্গে যথাযথভাবে মিলিয়ে বসানো গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের চশমায় লেন্সের অপটিক্যাল সেন্টার আপনার চোখের মণির অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললে দৃষ্টিতে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রিজম্যাটিক প্রভাবের কারণে চোখে চাপ, মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা বা ডাবল ভিশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কয়েক মিনিট অন্যের চশমা পরলেই চোখের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাবে। সাধারণত ভুল প্রেসক্রিপশনের চশমা সাময়িক অস্বস্তি বা ঝাপসা দৃষ্টি তৈরি করতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারের জন্য সঠিক প্রেসক্রিপশনই গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রেমের মাপও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়
ধরা যাক, দুই ব্যক্তির চোখের পাওয়ার হুবহু একই। তারপরও একজনের ফ্রেম অন্যজনের মুখে ঠিকমতো নাও বসতে পারে।
ফ্রেম খুব ঢিলেঢালা হলে বারবার নেমে যেতে পারে। আবার বেশি টাইট হলে নাক বা কানের পেছনে চাপ তৈরি হতে পারে। ফ্রেমের অবস্থান বদলে গেলে লেন্সের কেন্দ্রও চোখের তুলনায় সঠিক জায়গায় না থাকতে পারে।
তাই চশমা শুধু লেন্সের পাওয়ার অনুযায়ী তৈরি হয় না। ব্যবহারকারীর মুখ ও চোখের মাপও এর সঙ্গে জড়িত।
চশমা পরলে মাথাব্যথা হলে কী করবেন?
অন্যের চশমা পরে যদি মাথাব্যথা, চোখে চাপ, ঝাপসা দেখা, ডাবল ভিশন বা অন্য কোনো অস্বস্তি হয়, তাহলে সেটি খুলে ফেলুন।
চোখকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য জোর করে দীর্ঘ সময় এমন চশমা পরে থাকা উচিত নয়। নিজের চশমা না থাকলে জরুরি প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য অন্যের চশমা ব্যবহার করা এক বিষয়, আর নিয়মিত সেটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
দৃষ্টির সমস্যা বারবার হলে চোখ পরীক্ষা করিয়ে নিজের বর্তমান প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চশমা ব্যবহার করা ভালো। কারণ দৃষ্টির পরিবর্তন শুধু চশমার পাওয়ারের বিষয় নাও হতে পারে। চোখের পরীক্ষায় অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না, সেটিও বোঝা যায়।
শিশুদের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা দরকার
শিশুর চোখের ক্ষেত্রে অন্যের চশমা দিয়ে নিয়মিত কাজ চালানো উচিত নয়। তাদের দৃষ্টির বিকাশ চলতে থাকে এবং সঠিক দৃষ্টিসংশোধন গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো শিশুর চশমা প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করিয়ে তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন তৈরি করা উচিত। অন্য শিশুর একই পাওয়ারের চশমা থাকলেও সেটি নিজের শিশুর জন্য উপযুক্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
চোখের সংক্রমণ থাকলে চশমা ভাগাভাগি না করাই ভালো
চশমার ক্ষেত্রে শুধু পাওয়ারের বিষয় নয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার। কারও চোখে সংক্রমণ থাকলে তার চশমা অন্যের ব্যবহার না করাই ভালো।
বিশেষ করে কনজাংটিভাইটিসের মতো সংক্রমণ থাকলে চোখে হাত দেওয়ার পর চশমা স্পর্শ করার মাধ্যমে জীবাণু ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকতে পারে। তাই চোখে সংক্রমণ থাকলে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আলাদা রাখা ভালো।
তাহলে একই পাওয়ার হলে অন্যের চশমা কি একেবারেই পরা যাবে না?
বিষয়টি এতটা কঠোর নয়। কয়েক মিনিটের জন্য অন্যের চশমা পরলেই চোখের স্থায়ী ক্ষতি হবে, এমন কথা ঠিক নয়। কিন্তু একই পাওয়ার মানেই চশমাটি আপনার চোখের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত, সেটিও ধরে নেওয়া যাবে না।
বিশেষ করে নিয়মিত পড়াশোনা, কম্পিউটারে কাজ করা বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার ক্ষেত্রে নিজের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তৈরি চশমা ব্যবহার করাই ভালো।
চশমা পরার পর যদি পরিষ্কার দেখার বদলে চোখে চাপ, মাথাব্যথা, ঝাপসা বা ডাবল দেখা শুরু হয়, তাহলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত।
মনে রাখবেন, চশমার সঠিক পাওয়ারের পাশাপাশি সিলিন্ড্রিক্যাল পাওয়ার, অ্যাক্সিস, দুই চোখের মণির দূরত্ব, লেন্সের অবস্থান এবং ফ্রেমের ফিটিংও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বন্ধুর চশমার পাওয়ার আপনার সঙ্গে মিলে গেলেও সেটি আপনার নিয়মিত ব্যবহারের চশমার বিকল্প নয়।
সূত্র: টিভি ৯


-b910e4.jpg)