দিনের কোন সময়ে হার্ট অ্যাটাক ঝুঁকি বেশি, গবেষণায় উঠে এসেছে যে তথ্য

হার্ট অ্যাটাকের কথা শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হঠাৎ বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। তবে বাস্তবে হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ সব সময় এতটা স্পষ্ট নাও হতে পারে। একইভাবে এটি দিনের যেকোনো সময় ঘটতে পারলেও কিছু গবেষণায় দিনের নির্দিষ্ট সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে।
বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পরের কয়েক ঘণ্টায় শরীরে নানা ধরনের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। রক্তচাপ, হৃদ্স্পন্দন ও কিছু হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তনের কারণে এ সময় হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সকালে উঠলেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে। ব্যক্তির সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্য, বয়স, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপানসহ বিভিন্ন বিষয় ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দিনের কোন সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা সকালবেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পরের কয়েক ঘণ্টাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর বিশ্রাম অবস্থা থেকে সক্রিয় অবস্থায় ফিরে আসে। এ সময় রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে পারে। শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের মাত্রাতেও পরিবর্তন ঘটে।
তবে এই পরিবর্তনগুলো সুস্থ মানুষের জন্য স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। যাদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সকালে শরীরে কী পরিবর্তন ঘটে?
ঘুমের সময় শরীর অপেক্ষাকৃত বিশ্রাম অবস্থায় থাকে। ঘুম ভাঙার পর শরীর ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময় রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন বাড়তে শুরু করে।
একই সঙ্গে কর্টিসলের মাত্রাও সকালে স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। কর্টিসল শরীরকে ঘুম থেকে জেগে দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। তবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সকালে শরীরের এই পরিবর্তনগুলো হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনও দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে উপসর্গ আলাদা হতে পারে
হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না।
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বুকে ব্যথার পাশাপাশি অন্য কিছু লক্ষণও দেখা দিতে পারে। যেমন-
- শ্বাসকষ্ট
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- বমিভাব বা পেটের অস্বস্তি
- কাঁধ, পিঠ বা হাতের ব্যথা
- মাথা ঘোরা
- অস্বস্তি বা দুর্বল লাগা
এসব লক্ষণকে অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে বা হঠাৎ নতুন ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ
তীব্র মানসিক চাপ শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটায়। এ সময় হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়ে।
যাদের আগে থেকেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে তীব্র মানসিক চাপ হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের পাশাপাশি অনিয়মিত ঘুম, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তাই শুধু দিনের কোন সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি, সেটি জানলেই হবে না। সামগ্রিক জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানো যায়?
হার্ট অ্যাটাকের সব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে-
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলা
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা
- স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খাওয়া
- ওজন স্বাস্থ্যকর সীমার মধ্যে রাখা
- উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
- পর্যাপ্ত ঘুমানো
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
সকালে কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরকে ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে দেওয়া ভালো। বিশেষ করে যাদের হৃদ্রোগ রয়েছে বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম ও দৈনন্দিন কাজের রুটিন ঠিক করা উচিত।
হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কায় স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।
বুকে ব্যথা হলে অপেক্ষা নয়
হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ দেখা দিলে দিনের সময় বিবেচনা করে অপেক্ষা করা উচিত নয়। বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, হার্ট অ্যাটাক দিনের যেকোনো সময় ঘটতে পারে। কিছু গবেষণায় সকালে এর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেলেও, শুধু সময়ের ওপর নির্ভর করে ঝুঁকি বিচার করা যায় না। ব্যক্তির বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান ও জীবনযাপনসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
