শুধু বয়স নয়, পুরুষের টেস্টোস্টেরন কমিয়ে দিতে পারে এই কারণগুলো

পুরুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হরমোনগুলোর একটি টেস্টোস্টেরন। যৌনস্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতার পাশাপাশি পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্য, শক্তি এবং সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার সঙ্গেও এই হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে শুধু বয়স নয়, বিভিন্ন রোগ, শারীরিক সমস্যা ও জীবনযাপনের কারণেও এই হরমোনের মাত্রা কমে যেতে পারে।
অনেক সময় টেস্টোস্টেরন কমে গেলেও শুরুতে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। আবার কারও যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, ক্লান্তি, পেশির শক্তি কমে যাওয়া বা মেজাজের পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই এসব সমস্যার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
চলুন পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যাওয়ার কিছু কারণ জেনে নিই।
অণ্ডকোষের সমস্যা
পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের বড় অংশ অণ্ডকোষে তৈরি হয়। তাই অণ্ডকোষে কোনো ধরনের আঘাত, ক্ষতি বা রোগ হলে এই হরমোনের উৎপাদন কমে যেতে পারে।
দুর্ঘটনা বা গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি কিছু জন্মগত সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
কিছু সংক্রমণ
কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণ অণ্ডকোষে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। মামসের কারণে অণ্ডকোষে প্রদাহ বা অরকাইটিস হলে অণ্ডকোষের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে টেস্টোস্টেরন উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
অতিরিক্ত গরমের প্রভাব
অণ্ডকোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম শরীরের তুলনায় কিছুটা কম তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম পরিবেশে থাকা বা নিয়মিত অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকার কারণে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে শুধু গরম পরিবেশে থাকলেই টেস্টোস্টেরন কমে যাবে, এমনটা বলা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি ও অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শের প্রভাব ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে।
ডায়াবেটিস ও স্থূলতা
ডায়াবেটিস ও স্থূলতার সঙ্গে পুরুষদের কম টেস্টোস্টেরনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজন ও শরীরে চর্বি জমার সঙ্গে হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ওজন ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি হরমোনের ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মগত ও জিনগত কারণ
কিছু পুরুষ জন্মগতভাবেই এমন শারীরিক বা জিনগত সমস্যা নিয়ে জন্মান, যা টেস্টোস্টেরন উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। অণ্ডকোষের স্বাভাবিক গঠন বা কার্যকারিতায় সমস্যা থাকলেও হরমোনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
পিটুইটারি গ্রন্থি বা হাইপোথ্যালামাসের সমস্যা
টেস্টোস্টেরন তৈরির প্রক্রিয়ায় শুধু অণ্ডকোষ নয়, মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই দুই জায়গায় কোনো সমস্যা হলে অণ্ডকোষকে টেস্টোস্টেরন তৈরির প্রয়োজনীয় সংকেত ঠিকভাবে দেওয়া নাও হতে পারে। ফলে হরমোনের মাত্রা কমে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগ
লিভার বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে শরীরে হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। গুরুতর বা দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সময় টেস্টোস্টেরনের মাত্রাও কমে যেতে পারে।
জীবনযাপনের প্রভাব
অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের মতো বিষয়গুলো টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সামগ্রিক শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু ওষুধের প্রভাব
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি কিছু চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের ক্ষেত্রে এমন প্রভাব দেখা যেতে পারে।
তবে কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা উচিত নয়। ওষুধের কারণে টেস্টোস্টেরন কমছে বলে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
ঘুমের সমস্যা
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের সমস্যা হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি থাকলে শরীরের বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের চেষ্টা করা জরুরি।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
সব ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে কিছু ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। যেম-
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা
- স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খাওয়া
- অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- পর্যাপ্ত ঘুমানো
- ধূমপান এড়িয়ে চলা
- অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে বিরত থাকা বা কমানো
- দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা
- অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
টেস্টোস্টেরন কমে গেলে সবার একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পেশির শক্তি কমে যাওয়া, মেজাজের পরিবর্তন বা যৌন সক্ষমতায় সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
শুধু এসব উপসর্গের ভিত্তিতে টেস্টোস্টেরন কমে গেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
টেস্টোস্টেরন কমে গেলে চিকিৎসাও সবার জন্য এক নয়। কারণের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন বা কোনো হরমোনের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
শরীরে কোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে তা অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
