ফ্যাটি হার্ট কী, যেসব লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হবেন

শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে শুধু পেট বা কোমরের মাপই বাড়ে না, এর প্রভাব পড়তে পারে হৃদ্যন্ত্রের ওপরও। অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তে অতিরিক্ত চর্বি হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব সমস্যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ফ্যাটি হার্ট কথাটি ইদানীং স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় বেশ শোনা যায়। তবে এটি লিভারের ফ্যাটি রোগের মতো একটি নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। অনেক সময় হৃদ্যন্ত্রের চারপাশে বা হৃদ্যন্ত্রের টিস্যুতে অতিরিক্ত চর্বি, স্থূলতার প্রভাব কিংবা হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
তাই ফ্যাটি হার্টের কথা শুনে শুধু ঘরোয়া উপায়ে সমস্যাটি সারানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। হৃদ্যন্ত্রের কোনো সমস্যা আছে কি না, সেটি নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্যন্ত্র ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে না পারলে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পা ফুলে যাওয়া, দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ফ্যাটি হার্ট বলতে কী বোঝায়?
ফ্যাটি হার্ট কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি বা স্থূলতার সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের চারপাশে চর্বি জমা এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপের সম্পর্ক রয়েছে। আবার দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি ধমনির রোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা হৃদ্যন্ত্র দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ শুধু হৃদ্যন্ত্রে চর্বি আছে কি না, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। শরীরের সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যও হৃদ্যন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কোন লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন?
হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতায় সমস্যা তৈরি হলে লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে হঠাৎ করেও সমস্যা বাড়তে পারে।
অল্প কাজেই শ্বাসকষ্ট
আগে যে কাজ সহজেই করতে পারতেন, এখন সামান্য হাঁটা বা সিঁড়ি ওঠার পরই হাঁপিয়ে যাচ্ছেন? এমন পরিবর্তন অবহেলা করবেন না।
হৃদ্যন্ত্র ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে না পারলে শরীরের বিভিন্ন অংশে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে। ফুসফুসেও তরল জমতে পারে। ফলে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি সবসময় দুর্বল লাগে বা আগের তুলনায় সামান্য কাজেই বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, বিষয়টি খেয়াল করা দরকার।
হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহে সমস্যা হতে পারে। ফলে দৈনন্দিন কাজ করাও বেশি পরিশ্রমের মনে হতে পারে।
পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতায় ফোলা
হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় শরীরে অতিরিক্ত তরল জমতে পারে। এর ফলে পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতায় ফোলা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে দিনের শেষে ফোলা বাড়ছে কি না, সেটিও লক্ষ্য করা যেতে পারে। তবে পা ফুলে যাওয়ার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই শুধু এই লক্ষণ দেখে হৃদ্রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া
হঠাৎ কয়েক দিনের মধ্যে ওজন বেড়ে গেলে সবসময় সেটি চর্বি বাড়ার কারণে হয় না। শরীরে অতিরিক্ত তরল জমলেও দ্রুত ওজন বাড়তে পারে।
হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় তরল জমে গেলে এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসক যদি নিয়মিত ওজন মাপতে বলেন, তা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শুয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে। আবার রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হয়ে ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
এ ধরনের নতুন সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বুক ধড়ফড় করা
হৃদ্স্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত বা অনিয়মিত মনে হওয়া বিভিন্ন কারণে হতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার ক্ষেত্রেও বুক ধড়ফড় করার মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
বারবার এমন হলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে কারণ খুঁজে বের করা ভালো।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে-
- অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা
- উচ্চ রক্তচাপ
- ডায়াবেটিস
- রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল
- করোনারি ধমনির রোগ
- ধূমপান
- শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা
অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, করোনারি ধমনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা হৃদ্যন্ত্র দুর্বল হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফ্যাটি হার্ট হলে কি ঘরোয়া উপায়ে ভালো হওয়া সম্ভব?
শুধু ঘরোয়া কোনো উপাদান খেয়ে হৃদ্যন্ত্রের চর্বি দূর করা বা হৃদ্রোগ সারিয়ে ফেলার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, ধূমপান বন্ধ করা এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই ঘরোয়া টোটকাকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
খাবারের দিকে কীভাবে নজর দেবেন?
হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে খাবারে কয়েকটি পরিবর্তন আনা যায়।
শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখতে পারেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ভাজাপোড়া এবং স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার কমানো ভালো।
বিশেষ করে যাঁদের হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে লবণ বেশি খেলে শরীরে পানি জমে যেতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লবণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
ব্যায়াম কি উপকারী?
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে, রক্তচাপের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে এবং সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যা রয়েছে, তাঁরা নিজের ইচ্ছায় কঠিন ব্যায়াম শুরু করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে শারীরিক কার্যক্রম বাড়ানো নিরাপদ।
ধূমপান ছাড়ুন
ধূমপান হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির জন্য ক্ষতিকর। এটি রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে, রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান বন্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু সক্রিয় ধূমপান নয়, পরোক্ষ ধূমপান থেকেও যতটা সম্ভব দূরে থাকা উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের কোনো লক্ষণ নতুন করে দেখা দিলে বা আগের তুলনায় বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-
- অল্প পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া
- কয়েক দিনের মধ্যে অস্বাভাবিক ওজন বেড়ে যাওয়া
- শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট
- রাতে শ্বাসকষ্টে ঘুম ভেঙে যাওয়া
- বারবার বুক ধড়ফড় করা
- দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা কমে যাওয়া
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, হৃদ্যন্ত্রের এসব লক্ষণ নতুন করে দেখা দিলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
বুকব্যথা বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে কী করবেন?
বুকে চাপ বা ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি, ঠান্ডা ঘাম বা হঠাৎ গুরুতর দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে এটিকে শুধু ফ্যাটি হার্ট বা গ্যাসের সমস্যা ভেবে বসে থাকা ঠিক নয়।
এ ধরনের গুরুতর উপসর্গ হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ফ্যাটি হার্ট কথাটি শুনে ভয় পাওয়ার চেয়ে বিষয়টি ঠিকভাবে বোঝা বেশি জরুরি। এটি কোনো একক রোগের নাম নয়। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যা হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি, পা ফুলে যাওয়া, দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া বা বুক ধড়ফড়ের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বন্ধ এবং রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কোনো ঘরোয়া উপায় বা খাবারকে হৃদ্রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
সূত্র: নিউজ ১৮
