সামান্য ক্ষত থেকে অঙ্গ বিকল, কখন হতে হবে সতর্ক

হাত-পায়ে সামান্য কেটে যাওয়া, আঁচড় লাগা কিংবা ছোট কোনো ক্ষতকে আমরা সাধারণত খুব একটা গুরুত্ব দিই না। ক্ষতটি পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে অনেক সময় স্বাভাবিক কাজকর্মও চালিয়ে যাই। বেশিরভাগ ছোট ক্ষত সত্যিই কোনো বড় সমস্যা তৈরি করে না। তবে ক্ষতটি যদি সংক্রমিত হয় এবং সেই সংক্রমণ শরীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
এমন অবস্থায় দেখা দিতে পারে সেপসিস। এটি কোনো সাধারণ সংক্রমণ নয়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখালে সেপসিস হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ছোট ক্ষত থেকে কীভাবে সেপসিস হতে পারে?
ত্বক শরীরের বাইরের জীবাণুর বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দেয়। কোথাও কেটে গেলে বা আঁচড় লাগলে সেই সুরক্ষা সাময়িকভাবে নষ্ট হয়। ক্ষতস্থান দিয়ে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে স্থানীয় সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।
সব সংক্রমণ অবশ্য সেপসিসে পরিণত হয় না। কিন্তু কোনো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শরীরজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হতে পারে। তখন রক্তসঞ্চালন, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হতে পারে।

ত্বকের সংক্রমণ ও সংক্রমিত ক্ষত সেপসিসের সম্ভাব্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে। তাই ছোট ক্ষত হলেও সেটিতে সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ক্ষতস্থানে কোন লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন?
সাধারণ ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসার কথা। কিন্তু সংক্রমণ হলে ক্ষতস্থানের চারপাশে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন-
- ক্ষতস্থানের চারপাশ লাল হয়ে যাওয়া
- ফুলে যাওয়া
- ব্যথা বাড়তে থাকা
- ক্ষতস্থান থেকে তরল বা পুঁজ বের হওয়া
- ক্ষতস্থানের চারপাশে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া
- ক্ষত ভালো হওয়ার বদলে ক্রমেই খারাপ হওয়া
বিশেষ করে ক্ষতের সঙ্গে জ্বর বা শরীর খারাপ লাগা শুরু হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু ক্ষতস্থানের চেহারা দেখে সেপসিস নিশ্চিত করা যায় না। সেপসিস হলে পুরো শরীরে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সেপসিসের প্রাথমিক লক্ষণ কী?
সেপসিস দ্রুত গুরুতর অবস্থায় পরিণত হতে পারে। তাই কিছু লক্ষণ বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- জ্বর, কাঁপুনি বা অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগা
- দ্রুত হৃদস্পন্দন বা দুর্বল নাড়ির স্পন্দন
- শ্বাস নিতে কষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া
- প্রচণ্ড ব্যথা বা অস্বস্তি
- ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত ত্বক
- বিভ্রান্তি বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- খুব কম প্রস্রাব হওয়া
- ত্বক, ঠোঁট বা শরীরের কিছু অংশ ফ্যাকাশে, নীলচে বা ছোপছোপ হয়ে যাওয়া
তবে মনে রাখবেন, সব রোগীর ক্ষেত্রে সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায় না।
জ্বর না থাকলেও কি সেপসিস হতে পারে?
হ্যাঁ। জ্বর সেপসিসের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হলেও সবার ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ বা কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে।
তাই শুধু শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক আছে বলে গুরুতর সংক্রমণের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। সংক্রমণের সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, প্রচণ্ড দুর্বলতা, দ্রুত হৃদস্পন্দন বা ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যে কারও সংক্রমণ থেকে সেপসিস হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যেমন-
- খুব অল্প বয়সী শিশু
- বয়স্ক ব্যক্তি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তি
- ক্যানসারে আক্রান্ত বা ক্যানসারের চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তি
- দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
- সম্প্রতি গুরুতর অসুস্থতা, অস্ত্রোপচার বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যক্তি
- বড় ক্ষত, পোড়া বা ত্বকের সংক্রমণ থাকা ব্যক্তি
ডায়াবেটিসসহ কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
ছোট ক্ষত হলে কী করবেন?
ছোট ক্ষতকে অবহেলা না করে শুরু থেকেই পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষত ধরার আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করা উচিত। ক্ষত পরিষ্কার রাখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
ক্ষত শুকিয়ে আসছে কি না, লালভাব বা ফোলাভাব কমছে কি না এবং ব্যথা কমছে কি না, সেদিকে নজর রাখুন। ক্ষত পরিষ্কার ও ঢেকে রাখার পরামর্শও সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসি দিয়েছে।
ক্ষত ক্রমেই খারাপ হলে, পুঁজ বের হলে, লালভাব ছড়িয়ে পড়লে বা জ্বরসহ শরীর খারাপ লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?
সংক্রমণের পাশাপাশি যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বিভ্রান্তি দেখা দেয়, খুব দ্রুত শ্বাস নিতে হয়, ত্বক ফ্যাকাশে বা নীলচে হয়ে যায়, প্রচণ্ড কাঁপুনি হয় কিংবা শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা বা গরম হয়ে যায়, তাহলে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
সেপসিস একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় রক্তসহ অন্যান্য পরীক্ষা করে সংক্রমণ ও অঙ্গের ক্ষতির লক্ষণ খুঁজে দেখেন। চিকিৎসায় পরিস্থিতি অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, শিরায় তরল, অক্সিজেন এবং কখনও সংক্রমিত বা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু অপসারণের মতো ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
ছোট ক্ষত বলে ভুল করবেন না
হাতে সামান্য আঁচড় বা পায়ে ছোট কাটা দাগ দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অধিকাংশ ছোট ক্ষত সেপসিস তৈরি করে না। কিন্তু ক্ষতটি যদি ভালো হওয়ার বদলে ক্রমেই খারাপ হয় এবং তার সঙ্গে শরীরজুড়ে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়, তখন বিষয়টি আর সাধারণ ক্ষত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সেপসিসের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্ষত পরিষ্কার রাখা, সংক্রমণের লক্ষণ খেয়াল করা এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আনন্দবাজার


