সাক্ষাৎকারে মজনু মোল্লাহ/‘ব্যবসা হলো গাছের মতো, ফল পেতে ধৈর্য লাগে’

বাংলাদেশের ওষুধ ও কৃষি-শিল্প খাতের বিকাশে অনন্য ভূমিকা রাখা সফল উদ্যোক্তা এবং সাবেক তারকা অ্যাথলেট মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ। তার দক্ষ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস’ অনকোলজি (ক্যানসারের ওষুধ) খাতে বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদন করে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। একই সাথে পঞ্চগড়ে পরিবেশবান্ধব এগ্রো-ট্যুরিজম প্রকল্প ‘এভারেস্ট এগ্রো অ্যান্ড ফ্রুটিকালচার’ এবং সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী আবাসনের লক্ষ্যে ‘নেক্সজেন হোল্ডিংস’-এর মাধ্যমে তিনি বহুমাত্রিক শিল্পোদ্যোগের সফল প্রসার ঘটিয়েছেন।
বান্দুরা হলিক্রশ হাই স্কুল, নটর ডেম কলেজ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশ-বিদেশে অন্তত ১৫ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জনকারী মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ শৃঙ্খলা, ব্যবসায়িক রূপান্তর এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক বিরল সমন্বয় ঘটানোর জন্য সুপরিচিত।
সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ তিনি কথা বলেছেন তার শৈশব, খেলার মাঠ থেকে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার গল্প, ওষুধ খাতের বিকাশ ও সম্ভাবনা, এগ্রো-ট্যুরিজম এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য দিকনির্দেশনা নিয়ে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন রিয়াজুল করিম। প্রযোজনা করেছেন জায়েদ আল মাহবুব।
এশিয়া পোস্ট: আমরা শুরুতেই আপনার শৈশব, পড়াশোনা ও অ্যাথলেটিকসে যুক্ত হওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ধন্যবাদ, বিশেষ করে এশিয়া পোস্টকে। শৈশবকাল ও প্রাথমিক পড়াশোনা আমার ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের পুরাতন বান্দরা গ্রামে। সেখানে মিশনারি স্কুল বান্দুরা হলিক্রশ হাই স্কুল থেকে আমার স্কুলজীবন শুরু। সেখান থেকে ভালো ফল করে ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হই। পরবর্তীতে নটর ডেম কলেজ থেকেও নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়ার সুযোগ পাই। খেলাধুলার জগতে স্কুল থেকেই অ্যাথলেট হিসেবে আমার পরিচিতি শুরু। বিশেষ করে ফুটবল ছিল আমার প্রথম সারির খেলা। এছাড়া অ্যাথলেটিকসে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার দৌড় ও লং জাম্পে আমি সব সময় প্রথম হতাম।
এশিয়া পোস্ট: এই অ্যাথলেট হিসেবে পথচলা কি স্কুল জীবন থেকেই ছিল এবং কলেজে গিয়ে সেটি কেমন ছিল?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: স্কুল জীবন থেকেই আমি খেলায় যুক্ত ছিলাম। তবে নটর ডেম কলেজের সময়কালটা মাত্র দুই বছর ছিল, যা বেশ সংক্ষিপ্ত। সেখানে পড়াশোনার চাপ, ডিসিপ্লিন, ল্যাব ওয়ার্ক ও বিভিন্ন ক্লাবের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কারণে স্কুলে যতটুকু সময় দিতাম, ততটুকু দেওয়া সম্ভব হয়নি। নটর ডেম থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী মেডিকেল, বুয়েট বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায়, তাই সেই দুই বছর খেলায় সময় দেওয়া কঠিন ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে আমি ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবলে আমি এতটাই ভালো করেছিলাম যে সেখানে আবাহনী, মোহামেডান ও ব্রাদার্স ইউনিয়নসহ শীর্ষ সারির ক্লাবের খেলোয়াড়দের সাথে খেলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা খেলোয়াড়দের একজন ছিলাম। আন্তরিকতা, চেষ্টা ও ফোকাস ছিল বলেই পড়াশোনা ও খেলাধুলা উভয় ক্ষেত্রেই ভালো করা সম্ভব হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনার কি কখনো জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হয়েছিল বা কোনো পেশাদার টিমে যোগ দিয়েছিলেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: জাতীয় দলের অধিনায়ক যখন একদিকে খেলেছেন, আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের টিমের অধিনায়ক হিসেবে মুখোমুখি খেলেছি। তৎকালীন জাতীয় দলের অধিনায়ক রক্সি ভাই একদিকে খেলতেন, আমি অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় টিমের অধিনায়কত্ব করতাম। তবে জাতীয় দলে বা ক্লাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য না যাওয়ার মূল কারণ ছিল—আমি ফার্মেসিতে পড়াশোনা করছিলাম। খেলায় পুরোদমে ঢুকে গেলে ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা ও বিজনেসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। খেলাধুলা আমার প্যাশন ও আবেগের জায়গা হলেও মূল লক্ষ্য ছিল ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
এশিয়া পোস্ট: ফার্মেসির মতো কঠিন বিষয়ে পড়ে কীভাবে খেলাধুলার জন্য সময় বের করতেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: আমার খেলার সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম, বাইরের ক্লাবে যাইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচের অধীনে কঠোর পরিশ্রম করতাম। মানুষের যদি তীব্র ইচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনা থাকে, তবে সবই সম্ভব। তরুণদের প্রতি আমার বার্তা হলো—শুধু বইমুখী বা বুকিশ হয়ে থাকলে চলবে না। চারপাশের সমাজ, মানুষ ও দেশ নিয়ে ভাবতে হবে। দায়িত্ববোধ, ইচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণেই পড়াশোনা, খেলাধুলা ও ব্যবসা—সবকিছুর সমন্বয় করা সম্ভব হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: ব্যবসায় কীভাবে এন্ট্রি নিলেন? পড়াশোনা শেষ করেই কি ব্যবসা শুরু করেছিলেন, নাকি মাঝখানে চাকরি করেছিলেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষে দেশ-বিদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি। তবে ছাত্রজীবন থেকেই ফোকাস ছিল বিজনেসম্যান হব। বিফার্ম শেষ করে যখন ফ্যাক্টরিতে ইন-প্লান্ট ট্রেনিং করি, তখন পাইপলাইন দিয়ে অন্য কোম্পানির ওষুধ তৈরি হতে দেখে স্বপ্ন দেখতাম—কবে আমার নিজের কোম্পানি থেকে এভাবে ওষুধ বের হবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনি উল্লেখ করেছিলেন যে কলেজের আগেও কিছু ব্যবসা করেছিলেন, সেই প্রথম ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার গল্পটা যদি বলতেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ১৯৮৯ সালের দিকে এলাকায় টেলিকমিউনিকেশনের ব্যবসা শুরু করি। ‘কমিউনিকেশন ইজ সিভিলাইজেশন’—এই ভাবনা থেকে মানুষের কাছে টেলিফোন সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিই এবং ব্যবসাটি সফল হয়। তবে যেকোনো ব্যবসার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের উপকার করা এবং তা পরিবেশবান্ধব হওয়া। কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ বাড়িয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে ব্যবসা করা কখনোই ঠিক নয়।
এশিয়া পোস্ট: গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর বিজনেসে আসার আগের সময়টা কীভাবে অতিবাহিত করলেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ব্যবসায়ী হওয়ার লক্ষ্য থাকায় বাংলাদেশে একাধিক কোম্পানিতে প্রায় ৮ বছর চাকরি করেছি। শেখার জন্য দ্বিগুণ সময় দিয়েছি। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়মকানুন বুঝতে বিদেশে যাই। দেশ-বিদেশে অন্তত ১৫ বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করে তবেই বাংলাদেশে সরাসরি ব্যবসায় নামি।
এশিয়া পোস্ট: ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে তো কাজের বিশাল পরিধি রয়েছে। আপনারা কীভাবে কাজ শুরু করলেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: আমরা ইনহাউস প্রোডাকশনের চেয়েও ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটপ্লেসকে বেশি ফোকাস করেছি। শুরুতেই একটি নিশ মার্কেট অর্থাৎ অনকোলজি (ক্যানসারের ওষুধ) নিয়ে কাজ শুরু করি। এই বিশেষায়িত ওষুধ উৎপাদনে আমরা সরাসরি প্রোডাকশনে যাই এবং গ্লোবাল মার্কেটকে টার্গেট করি।
এশিয়া পোস্ট: ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিতে লাইসেন্সিং ও টেকনিক্যাল জটিলতা অনেক বেশি। এই চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করেছেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ব্যবসায় নামার আগে প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর আমরা ব্যাকগ্রাউন্ডে টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন, ড্রাগ পলিসি ও প্রোডাকশনের বিস্তারিত কাজ করেছি। আমরা আগে থেকেই শিল্প উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ড্রাগ পলিসিসহ সরকারি নিয়মকানুন মেনে সব ব্যবস্থা গুছিয়ে নিয়েছিলাম।
এশিয়া পোস্ট: এই দীর্ঘ পথচলা থেকে নতুন উদ্যোক্তা বা স্টার্টআপদের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: নতুন উদ্যোক্তাদের প্রথমে যে সেগমেন্টেই কাজ করুক না কেন, সেটির নাড়ি-নক্ষত্র, ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ জানতে হবে। হুট করে রাতারাতি লাভের আশা করা যাবে না। ব্যবসা হলো একটি গাছ রোপণ করার মতো—বীজ রোপণ, পরিচর্যা ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফল আসে, ব্যবসায়ও তেমনি ধৈর্য থাকতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনার ‘এভারেস্ট এগ্রো অ্যান্ড ফ্রুটিকালচার’ প্রজেক্টে মূলত কী ধরনের কাজ হচ্ছে?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: পঞ্চগড়ে সাড়ে ছয় হাজার আমগাছ নিয়ে পুরোপুরি অর্গানিক উপায়ে আম উৎপাদন করছি, যা বিদেশে রপ্তানির প্রক্রিয়াধীন। পাশাপাশি গরু, হাঁস এবং প্রায় ১০ হাজার দেশি মুরগির খামার ও মাছ চাষের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে একটি রিসোর্ট রয়েছে, যেখান থেকে দূর দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতের দৃশ্য দেখা যায়। মন ও জীবনের একঘেয়েমি কাটাতেই প্রাকৃতিক পরিবেশে এই উদ্যোগ।
এশিয়া পোস্ট: আপনার এই রিসোর্ট ও এগ্রো উদ্যোগকে কি ‘এগ্রো ট্যুরিজম’ বলা যায়?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: অবশ্যই কিছুটা বলতে পারেন। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের সমন্বয়ে একটি সুস্থ দেহ, সুস্থ মন ও সুস্থ দেশ গঠনের ভাবনা থেকে এগ্রো ট্যুরিজমের এই রূপায়ণ।
এশিয়া পোস্ট: আপনার অপর প্রতিষ্ঠান ‘নেক্সজেন হোল্ডিংস’ নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছি। মুনাফার মার্জিন কম রেখে ঢাকার উপকণ্ঠে বা বাইরে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে প্রকৃত চিকিৎসা পাবে।
এশিয়া পোস্ট: ক্যানসারের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আপনাদের উৎপাদিত ক্যানসারের ওষুধ কতটা সাশ্রয়ী?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: বিশ্ববাজারের তুলনায় আমাদের ওষুধ অত্যন্ত সাশ্রয়ী। মূল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের যেসব ক্যানসারের ওষুধের দাম ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা, তা এলডিসি সুবিধার কারণে আমরা চার থেকে পাঁচ লাখ টাকায় দিতে পারছি। আর যেসব অতি দরিদ্র রোগী একেবারেই অপরাগ, তাদের আমাদের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিনামূল্যে বা অনুদানের মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। মানবিক মনোভাব নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
এশিয়া পোস্ট: ক্যানসার চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটিক্সের ব্যবহার বাড়ছে। এ প্রযুক্তি আপনাদের হাসপাতালে যুক্ত করার ইচ্ছা আছে?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: অবশ্যই। বিশ্বমানের প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে রোবটিক্স বা এআই প্রযুক্তির যে অগ্রগতি হচ্ছে, আমাদের পরিকল্পনাধীন হাসপাতালেও আমরা তা যুক্ত করব।
এশিয়া পোস্ট: দেশের ওষুধ খাতে দাম নির্ধারণ ও সরবরাহ নিয়ে প্রায়ই সিন্ডিকেটের যে অভিযোগ ওঠে, সে বিষয়ে আপনার মতামত কী?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় বাংলাদেশে ওমিপ্রাজল বা প্যারাসিটামলের দাম সবচেয়ে সাশ্রয়ী। ডলার ও কাঁচামালের দাম বাড়লেও আমাদের দেশে ওষুধের দাম স্থিতিশীল রাখা হয়েছে, তাই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর অভিযোগের কোনো বাস্তবতা নেই।
এশিয়া পোস্ট: অনেক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে কেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: এটি মূলত দেশীয় ফার্মা কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রমাণ। দেশীয় কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ কম দামে সরবরাহ করায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।
এশিয়া পোস্ট: এনার্জি সংকট বা নীতিগত বাধা কি বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: কিছুটা প্রভাব তো ফেলেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সিকিউরিটি, এনার্জি সুবিধা ও সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক।
এশিয়া পোস্ট: গবেষণাগারে (আরঅ্যান্ডডি) প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও এজেন্ট তৈরিতে আমরা কতটা স্বাবলম্বী হতে পেরেছি?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ফার্মা শিল্পে বাংলাদেশ ব্যাপক সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে মানের কোনো শেষ নেই। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে বৈশ্বিক সর্বোচ্চ স্তরের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
এশিয়া পোস্ট: ওষুধ শিল্পের চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাকাডেমিক শিক্ষার কোনো ঘাটতি রয়েছে কি?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদার সাথে মিল রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাক্রম ও প্র্যাকটিক্যাল নলেজের পরিধি আরও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
এশিয়া পোস্ট: কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনারা কীভাবে সঠিক লোক নির্বাচন করেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: সঠিক স্থানের জন্য সঠিক জনবল বাছাই জরুরি। নলেজ, এক্সপেরিয়েন্স, অ্যাটিটিউড ও ভিশন বিবেচনা করে লিখিত পরীক্ষা ও একাধিক ভাইভার মাধ্যমে দক্ষ কর্মী রিক্রুট করা হয়।
এশিয়া পোস্ট: শুরুতে আপনাদের প্রতিষ্ঠানে কতজন কর্মী ছিল এবং বর্তমানে কতজন কাজ করছেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: আমরা পাঁচজন ডিরেক্টর নিজেরাই কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করি। ১১শ’ স্কয়ার ফিটের একটি শেয়ার্ড অফিস ও ১০-১২ জন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে অনকোলজি, ভাইরোলজি, হেপাটোলজি ইত্যাদি বিভাগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কর্মী আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।
এশিয়া পোস্ট: এত বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ম্যাক্রো ও মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট কীভাবে সামলান?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: নলেজ, অভিজ্ঞতা, ইচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এটি সম্ভব। কর্মীদের পরিবারের সদস্যের মতো মনে করে তাদের পেশাদারিত্ব ও কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
এশিয়া পোস্ট: দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের অনেকে উদ্যোক্তা হতে চান। তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: ব্যবসায় সফল হতে হলে প্রাথমিক ক্ষতি ও চড়াই-উতরাই পেরোনোর মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। যে ব্যবসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্র্যাকটিক্যাল নলেজ নেই, তাতে হুট করে যাওয়া উচিত নয়। প্রথমে কোর ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠিত করে তারপর ডাইভার্সিফিকেশনে যেতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক ওষুধের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: পূর্বে আন্তর্জাতিক ফার্মাকোপিয়া ও প্রসেস মেইনটেইন না করায় আয়ুর্বেদিক কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। এখন সঠিক প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় হারবাল ও নিউট্রাসিউটিক্যালসের চাহিদা আবার বাড়ছে।
এশিয়া পোস্ট: জীবন শেষে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য আপনার ভাবনা ও সামাজিক উদ্যোগগুলো কী কী?
মোহাম্মদ মজনু মোল্লাহ: আমাদের সবাইকে একদিন বিদায় নিতে হবে। তাই প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় সাহায্য করা, বন্যা ও দুর্যোগে পাশে থাকা এবং মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা প্রদান করি। ভালো কাজ ও মানবিক মূল্যবোধই মৃত্যুর পরও টিকে থাকার একমাত্র উপায়।


