logo

‘এনসিপি কিংস পার্টি নয়, কিং মেকার পার্টি’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘এনসিপি কিংস পার্টি নয়, কিং মেকার পার্টি’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব তাহসিন রিয়াজ। বিতর্কের মঞ্চ থেকে এখন জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, এনসিপির রাজনীতি এবং সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ছাত্রজীবনে দীর্ঘদিন বিতর্ক (ডিবেট) করেছেন এবং বর্তমানে রাজনীতি করছেন। বিতর্কে যুক্তিতর্ক দিয়ে জয়ী হওয়া যায়, কিন্তু রাজনীতির মাঠে অনেক সময় আপস করতে হয়। বিতর্কে অংশ নেওয়া তাহসিন রিয়াজ ও আজকের রাজনীতিবিদ তাহসিন রিয়াজের মধ্যে পার্থক্য কীভাবে দেখেন?

তাহসিন রিয়াজ: চমৎকার প্রশ্ন। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন দীর্ঘ সময়জুড়ে বিভিন্ন যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের কেটেছে। বিতর্কের প্রস্তুতির সময় আমাদের একটি পরিকল্পনা থাকত। যে কোনো বিষয়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকেরই প্রস্তুতি নেওয়া। একই যুক্তিকে কীভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা নিয়ে আমরা অনুশীলন করতাম। সেটি ছিল একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, আর প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার একটি আলাদা মনস্তত্ত্ব কাজ করে।

তবে রাজনীতিতে বা গণমাধ্যমের আলোচনায় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা বলার সময় কেবল ‘জিততেই হবে’, এই সাইকোলজি কাজ করে না। সেখানে মূল লক্ষ্য থাকে কতটুকু সঠিক তথ্য ও ইতিবাচক বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এমনকি কোথাও যদি আপস বা স্যাক্রিফাইস করতে হয়, তবুও জয়ী হওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, এনসিপির ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা আইনি পদ্ধতির সঙ্গে যদি দলের কোনো কার্যক্রম সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে, আমরা আইনি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। দলীয় সুবিধার চেয়ে সত্য ও সঠিক বার্তা পৌঁছানোই রাজনীতির আসল কাজ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য থাকে জেতা, আর রাজনীতির উদ্দেশ্য হলো সত্যকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে সবচেয়ে ভুল যুক্তি কোনটি দেওয়া হয়?

তাহসিন রিয়াজ: বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুল যুক্তি হলো ‘ভুয়া প্রতিশ্রুতি’ বা ফেক কমিটমেন্ট। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির শুরুটাই হয় এই ভুল যুক্তি দিয়ে যে, ‘আমি আপনাকে একটি সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত ও সুন্দর দেশ উপহার দেব।’ একটি রাষ্ট্রকে যখন রাষ্ট্রকল্প হিসেবে চিন্তা করবেন, তখন মনে রাখতে হবে যেখানে মানুষ আছে, সেখানে অপরাধ প্রবণতাও থাকবে। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রকেই শতভাগ অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়। মূল বিষয় হলো, সঠিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং দুর্নীতি। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় আসার সময় বিশাল প্রতিশ্রুতি দেন। যেমন—বর্তমান বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘মবের রাজত্ব শেষ হবে’। কিন্তু সাত মাস পার হওয়ার পর যদি প্রশ্ন করেন মব কি শেষ হয়েছে? উত্তর হবে, না। এখন শুধু ভাষাগত টার্মিনোলজি পরিবর্তন করে বিষয়টিকে ঘুরিয়ে বলা হচ্ছে। ট্র্যাডিশনাল বা প্রচলিত রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করা, আর এটিই হলো রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুল যুক্তি। আমরা এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।

এশিয়া পোস্ট: বিতর্কে এক রাউন্ডে হারলে পরের রাউন্ডে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে। রাজনীতিতে হেরে গেলে কী ঘটে?

তাহসিন রিয়াজ: খুবই গভীর একটি প্রশ্ন এটা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে রাজনীতিতে হেরে গেলেও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটে। আমাদের ইতিহাস বলে, বহু চিহ্নিত অপরাধী ও খুনি বিভিন্ন সময় বীরদর্পে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। যারা সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তারাই সকালে দেওয়া কথা দুপুরে ভুলে গিয়ে রাতে জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়ে যায়।

এশিয়া পোস্ট: এখানে কি জনগণ দায়ী নয়?

তাহসিন রিয়াজ: অবজ্ঞা করে বলছি না, কারণ জনগণ মানে তো আপনি এবং আমিই। তবে নীতিগতভাবে, মারাত্মক কোনো ভুল বা রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধের পর রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন হওয়া উচিত নয়। মানুষের ভুল গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু যদি কেউ রাষ্ট্রতত্ত্ব ও জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গণহত্যা বা পাপাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তার রাজনীতিতে ফেরার কোনো অধিকার থাকা উচিত নয়। যেমন—শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে যদি বলি, তিনি গণহত্যা চালিয়েছেন। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ফেরার সুযোগ থাকা উচিত নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অপশক্তিও অতীতে ফিরে এসেছে।

এশিয়া পোস্ট: এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কেমন রাজনীতি চায়?

তাহসিন রিয়াজ: বিগত ৫ আগস্টের আগে, ৩ আগস্টের শহীদ মিনারের ঐতিহাসিক সমাবেশ থেকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দুটি প্রধান অঙ্গসংস্থান ঘোষণা করেছিলেন, একটি হলো ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ এবং অন্যটি হলো ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বা নিউ সেটেলমেন্ট। এগুলোই এনসিপির রাজনীতির মূল দর্শন।

‘নতুন বন্দোবস্ত’ বলতে আমরা বুঝি রাষ্ট্রের সেই মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন, যার অভাবে রাষ্ট্র তার নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে না। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা, আমলাতন্ত্রকে সংস্কার করা এবং প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সচল করাই হলো নতুন বন্দোবস্তের কাজ। বিগত ১৬ বছরে একটি প্রতিষ্ঠানকেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। ক্ষমতার তোষামোদি না করে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।

আর ‘ফ্যাসিবাদ বিলোপ’ বলতে আমরা কেবল একজন ব্যক্তিকে বোঝাই না। শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদের দৃশ্যমান প্রতিনিধি হতে পারেন, কিন্তু এটি একটি আদর্শিক ও নীতিগত ব্যাধি। আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও প্রশাসনের ভেতর চেপে বসা এই ফ্যাসিবাদের ভূতকে সম্পূর্ণ বিলোপ করাই এনসিপির মূল অঙ্গীকার।

এশিয়া পোস্ট: এনসিপি প্রতিষ্ঠার সময় তারুণ্যনির্ভর নতুন রাজনীতির একটি আশার আলো দেখা গিয়েছিল। আপনারা কি এখনও সেই জায়গাতেই আছেন?

তাহসিন রিয়াজ: আমরা নিঃসন্দেহে আমাদের নীতিতে অটল আছি। ইতোমধ্যে আমরা দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় আমাদের সাংগঠনিক কমিটি গঠন করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক দলের তুলনায় এনসিপিতেই তরুণদের সর্বাধিক অংশগ্রহণ ও সমাবেশ ঘটেছে।

পার্থক্যগুলোর কথা বললে প্রথমত, এনসিপিতে কোনো পরিবারতন্ত্র নেই। দ্বিতীয়ত, এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। দলে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত নিয়েও আমরা প্রকাশ্যে সমালোচনা করি। আমি নিজে অন-এয়ারে থেকেও দলের সমালোচনা করেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ভুলত্রুটি নিয়ে নিজেরা সমালোচনা করে সংশোধন হওয়ার সংস্কৃতি এনসিপিতেই আছে। এ ছাড়া আমরা সরকারের পাশে থেকে গঠনমূলক ‘ছায়া বাজেট’ ও বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রস্তাব দিয়েছি, যা অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা প্রায়ই ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা’র কথা বলেন। এই আকাঙ্ক্ষা আসলে কী?

তাহসিন রিয়াজ: জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা মানে কেবল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা নয়। একটি গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রে যদি এখনও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হয়, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকে, তবে সেখানে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। ফ্যাসিবাদের স্বভাব যেখানে থাকবে, সেখানে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুপস্থিত।

এশিয়া পোস্ট: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের বড় সুবিধাভোগী কারা?

তাহসিন রিয়াজ: সুবিধাভোগীর কথা যদি বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বাংলাদেশের প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সুফল পেয়েছে বিএনপি। ১৯৭৫ সালের সিপাহি বিপ্লবে জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি থাকা সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক সুবিধা দিনশেষে তার দলই পেয়েছিল। ১৯৮৫, ১৯৯৪ কিংবা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানেও দেখা গেছে—যে তরুণরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে রক্ত দিল, তাদের নাম পাশে সরিয়ে সব রাজনৈতিক সুবিধা বিএনপিই গ্রহণ করেছে।

এশিয়া পোস্ট: গণ-অভ্যুত্থানের পর বিপ্লবীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার যে প্রবণতা দেখা যায়, তার পেছনে কারণ কী?

তাহসিন রিয়াজ: এর পেছনে দুটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, বিএনপি একটি দীর্ঘ অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল। দ্বিতীয়ত, আমাদের রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও এস্টাবলিশমেন্ট। আমলাতন্ত্র কখনোই এমন কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন গ্রহণ করতে চায় না, যা তাদের কায়েমী স্বার্থ বা সুবিধা কমিয়ে দেয়। তারা সবসময় ক্ষমতাসীদের তোষামোদ করতে পছন্দ করে।

ফলে মিডিয়া ও বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিপ্লবীদের চরিত্রহনন ও ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। যেমন—আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হলো। পরে দেখা গেল পুরো তথ্যটিই মিথ্যা। ইতিহাস বলে, বিপ্লব অনেক সময় নিজের সন্তানদের গ্রাস করে। বিপ্লবীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে দিয়ে পুরোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো তার সুফল ভোগ করে।

এশিয়া পোস্ট: প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটা প্রধান প্রতিপক্ষ থাকে। এনসিপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কে?

তাহসিন রিয়াজ: একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের প্রধান ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করা। তাই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপিই আমাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তাদের নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক ভুলের গঠনমূলক সমালোচনা করাই আমাদের দায়িত্ব।

এশিয়া পোস্ট: এনসিপি গঠনের শুরু থেকেই কিংস পার্টি ট্যাগ দেওয়া। এই বিষয়টা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

তাহসিন রিয়াজ: আমরা কিংস পার্টি নই, আমরা ‘কিং মেকার পার্টি’। আমরা রাজপথে বিপ্লব সংঘটিত করে কিংস বা রাজাদের তৈরি করেছি, বিএনপিকে ক্ষমতায় বসার সুযোগ করে দিয়েছি। আমাদের কিংস পার্টি বলা স্রেফ একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনের বেশকিছু পরিচিত মুখ—যেমন মাহফুজ আলম, আব্দুল কাদের বা উমামা ফাতেমা এনসিপিতে আসেননি, আবার তাসনিম জারার মতো কেউ কেউ চলেও গেছেন। তাহলে কি এনসিপি জুলাইকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারছে না?

তাহসিন রিয়াজ: একসঙ্গে আন্দোলন করা মানেই সবাইকে এক দল বা রাজনৈতিক ব্যানারেই থাকতে হবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক নয়। কাদের বা মাহফুজ আলম এনসিপিতে আসেননি, এটি তাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এতে জুলাই আন্দোলনে তাদের অবদান এতটুকুও কমে যায় না। তারা চাইলে নিজস্ব ভাবধারায় নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারেন, আমরা তাকে স্বাগত জানাই।

জুলাইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটানো। সেই লক্ষ্য অর্জনের পর বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি নিজ নিজ আদর্শ নিয়ে কাজ করছে। এখানে দ্বন্দ্বের কিছু নেই, এটিই চব্বিশের স্বাধীনতার আসল পরিচয়।

এশিয়া পোস্ট: এনসিপি কি এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্তগত কোনো ভুল করেছে? আপনারা কি বর্তমানে কোনো ইমেজ সংকটে ভুগছেন?

তাহসিন রিয়াজ: ৮ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন না করে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠন করা যেত, তবে হয়তো আজকের বহু অপ্রাপ্তি ও প্রশাসনিক সংকট তৈরি হতো না। সেটি একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা ছিল, যা তৎকালীন বাস্তবতায় সম্ভব হয়নি। তবে এনসিপি কোনো ইমেজ সংকটে ভুগছে না। দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষের কাছে এনসিপি দারুণভাবে সমাদৃত ও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, সেটার জন্য নিশ্চয় এনসিপির ওপর প্রভাব পড়ছে। আপনারা কীভাবে মোকাবিলা করছেন?

তাহসিন রিয়াজ: এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডা। ক্ষমতা ও মিডিয়ার জোর ব্যবহার করে এই ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, যদি সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ কোনো তদন্ত করতে চান, করুন। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে হেয় করা হলে আমরা আমাদের সহযোদ্ধার পাশে দাঁড়াব। ইতোমধ্যে দুদক থেকেও বলা হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত নয়। একটি দায়িত্বশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে এত বড় অসত্য প্রপাগান্ডা ছড়ানো রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত।

এশিয়া পোস্ট: সমালোচকরা বলে থাকেন এনসিপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আবেগ ব্যবহার করে রাজনীতি করছে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ কেউ নেই। এর উত্তরে কী বলবেন?

তাহসিন রিয়াজ: জুলাইয়ের আবেগ আমাদের মূল পরিচয়, আমরা তাকে লালন করবই। আর অভিজ্ঞতার প্রশ্নে বলব, অভিজ্ঞতার চেয়ে বড় হলো দক্ষতা ও সৎ ইচ্ছা। আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সফলভাবে পরিচালনা করেছেন এবং তার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।

অন্যদিকে, বিগত ৪০-৫০ বছরের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় বসে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যে অভিজ্ঞতা জনগণের কল্যাণ করে না, সেই অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই। আমরা আমাদের নীতি ও কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করছি যে সততা ও দক্ষতাই মূল শক্তি।

এশিয়া পোস্ট: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির টার্গেট কী? আপনাদের কি যথেষ্ট জনবল ও সামর্থ্য আছে?

তাহসিন রিয়াজ: নতুন দল হিসেবে আমাদের সাংগঠনিক সামর্থ্যে কিছুটা ঘাটতি আছে, এটি অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে মাত্র দুই বছরের মধ্যে আমরা দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কাজ ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। আমরা ইতোমধ্যে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ১০০ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছি এবং আরও ১০০ জন পাইপলাইনে আছে।

আমরা কোনো জোটের অধীনে নয়, বরং এককভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেব। মানুষ একটি নতুন ধারার পরিবর্তন চায়। জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ১১ দলীয় জোটে আছেন। স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দিলে জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে কি না?

তাহসিন রিয়াজ: রাজনৈতিক মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে কিছুটা দূরত্ব বা সংকট তৈরি হতেই পারে। তবে জামায়াতের সঙ্গে আমাদের ঐক্যের ভিত্তি ছিল চব্বিশের জুলাই সনদ, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন। স্থানীয় নির্বাচন একসঙ্গে করার কোনো চুক্তি আমাদের মধ্যে হয়নি।

গণতান্ত্রিক পরিবেশে আমরা আমাদের বার্তা নিয়ে মানুষের কাছে যাব, তারা তাদের মতো প্রচারণা করবে। জনগণ যাকে ভালো মনে করবে, তাকেই নগরপিতা হিসেবে বেছে নেবে।

এশিয়া পোস্ট: প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় এনসিপির স্থানীয় প্রার্থীদের বিশেষত্ব কী হবে?

তাহসিন রিয়াজ: আমাদের প্রার্থীদের মূল পরিচয় হবে তারা ‘জুলাইপন্থি’। তারা হবেন সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদবিরোধী, জেনুইন অ্যাকাউন্টেবল এবং জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ধারণকারী। আর বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের তুলনার বিষয়ে বলব, আমরা বিএনপিকে ঢালাওভাবে আওয়ামী লীগ বলি না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের ফ্যাসিবাদী আচরণের ফুটস্টেপ দেখলে আমরা সতর্ক করে দিই। তারা যদি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বা আগের দমনমূলক নীতি বজায় রাখতে চায়, তবে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে।

এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারকে কয়েক মাসের মাথায় ব্যর্থ বলা বিএনপি বর্তমান সরকারের সাত মাসে কতটা সফলতা দেখাতে পেরেছে?

তাহসিন রিয়াজ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি প্রতিদিন কৃত্রিম আন্দোলন ও দাবি পেশ করে সরকারকে ব্যস্ত ও দুর্বল করে রাখত। আজ নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে সেই আন্দোলনগুলো অলৌকিকভাবে গায়েব হয়ে গেছে! তার মানে এগুলো ডিস্টার্ব তৈরি করার জন্যই করা হতো।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও প্রশাসনিক দক্ষতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান সরকার তাদের তথাকথিত ‘অভিজ্ঞতা’ নিয়ে মারাত্মক ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা তাদের প্রশাসনিক দক্ষতা দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: গণ-অভ্যুত্থানের আগে সরকারি পদায়ন ও নিয়োগে দলীয়করণের যে অভিযোগ ছিল, এসবের কতটা পরিবর্তন এসেছে?

তাহসিন রিয়াজ: কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আগের মতোই দলীয় পরিচয়ে ও স্বজনপ্রীতিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের গণবিক্ষোভ প্রমাণ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন হচ্ছে না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও যোগ্য মানুষদের অন্য দল থেকে এনে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। আমরা চাই দলমত নির্বিশেষে কেবল নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেওয়া হোক।

এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ইস্যু আছে। নির্বাচনি জোট করার ক্ষেত্রে বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

তাহসিন রিয়াজ: ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের অবস্থান শতভাগ আপসহীন। তবে ১৯৭১ সালের পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত কি বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে এক দিনের জন্যও অনুপস্থিত ছিল? জিয়াউর রহমান, শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া— সবাই জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছেন।

তাহলে চব্বিশের জুলাই সনদ ও নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়নের জন্য যদি আমরা একটি কৌশলগত রাজনৈতিক জোট করি, তবে কেবল আমাদের ক্ষেত্রেই কেন ’৭১-এর প্রশ্ন তোলা হবে? চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে যারা বুকের রক্ত দিয়েছে, তারাই ’৭১-এর মূল চেতনাকে ধারণ করে। ’৭১ নিয়ে যারা ব্যবসামুখী রাজনীতি করে, তাদের চেয়ে আমরা দেশকে অনেক বেশি ভালোবাসি।

এশিয়া পোস্ট: আগামী ৫ বছর পর রাজনৈতিকভাবে এনসিপিকে কোথায় দেখতে চান?

তাহসিন রিয়াজ: আমাদের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট বলেছেন, ১০ বছর পর এনসিপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমরা নিজেদের একটি শক্তিশালী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। কোনো অসাধু উপায়ে নয়, বরং জনগণের ভালোবাসা, আস্থা ও ভোটের মাধ্যমেই আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই।

এশিয়া পোস্ট: দল পরিচালনার জন্য এনসিপির অর্থের উৎস কী?

তাহসিন রিয়াজ: আমাদের ফান্ডিং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া ক্রাউড ফান্ডিং, ওয়েবসাইট অনুদান এবং দলের ভেতরের শুভানুধ্যায়ীদের অনুদানেই আমাদের সংগঠন চলে। আমরা কোনো চাঁদাবাজি বা অবৈধ অর্থের ওপর নির্ভরশীল নই। বিভিন্ন কর্মসূচি অনুযায়ী আমাদের শুভানুধ্যায়ীরা স্বেচ্ছায় কন্ট্রিবিউট করেন। জামায়াত তাদের নিজস্ব অর্থায়নে চলে, আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

এশিয়া পোস্ট: গণমাধ্যমের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

তাহসিন রিয়াজ: আমরা চাই গণমাধ্যম সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসিকতার সঙ্গে সত্য উপস্থাপন করুক। আপনারা এনসিপির কঠোর সমালোচনা করুন, চুলচেরা বিশ্লেষণ করুন, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে কোনো রাজনৈতিক অপপ্রচারের হাতিয়ার না হয়ে আপনারা সত্য প্রকাশে আপসহীন থাকুন এবং জনগণের পাশে দাঁড়ান।