Advertisement

বিশেষ সাক্ষাৎকার/মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ঠিক করা হবে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী

মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ঠিক করা হবে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিএনপি সরকারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। বিএনপির প্রয়াত নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার জ্যেষ্ঠ পুত্র তিনি। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্জন, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিতকরণ, শহীদের সঠিক তালিকা প্রণয়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তায়নে কাজ করছেন ইশরাক। নিজের কার্যক্রম এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার আতিক হাসান

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান সমস্যা কী?

ইশরাক হোসেন: মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ওয়ান অব দ্য বিগ প্রবলেম’ হচ্ছে চিকিৎসাজনিত। আমরা চেষ্টা করছি আরেকটু ভালো সেবা কীভাবে দেওয়া যায়। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য, তাদের জন্য সরকারিভাবে যে বরাদ্দ রয়েছে যথেষ্ট নয়। যদিও বর্তমান অর্থবছরে তাদের বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। তাদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য যেসব হাসপাতালের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে, সেখানে তাদের সেবাটা একটু ভালো করতে পদক্ষেপ নিয়েছি।’

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে খেতাবপ্রাপ্ত কতজন মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন, আপনাদের কাছে কি এ তথ্য আছে?

ইশরাক হোসেন: অবশ্যই আমাদের মন্ত্রণালয়ে এই তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু এখন সঠিক তথ্যটা দিতে পারছি না। আরেকটি বিষয়, আপনি অবগত আছেন যে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট নামে একটা ট্রাস্ট আছে এবং সেই ট্রাস্ট থেকেও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আলাদাভাবে পাবেন। শুধু খেতাবপ্রাপ্ত যারা মুক্তিযোদ্ধা আছেন তাদের তথ্য সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও আছে। এটা নিয়ে আপনাদের চিন্তা-ভাবনা কী?

ইশরাক হোসেন: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করা। যেহেতু এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় বিগত সরকার অমুক্তিযোদ্ধাদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা সবারই জানা। আমার বক্তব্য স্পষ্ট, আমরা ওয়াকিবহাল রয়েছি, আমরা চাই যে একটা কর্মপদ্ধতি ঠিক করে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে যাব। এই বিষয়ে আমরা আরও পূর্ণাঙ্গ কর্মপদ্ধতি যখন নির্ধারণ করতে পারব, তখন আমরাই গণমাধ্যমে সামনে এসে বলব। আমরা অবশ্যই এই তালিকা সংশোধনে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমাদের টার্গেট রয়েছে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে আমরা প্রত্যেকটি ইউনিয়ন প্রত্যেকটি উপজেলায় সরেজমিনে একটা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করব। এ সংক্রান্ত একটা প্রজেক্টও হাতে নেওয়া হবে। আশা করছি, আমরা তালিকাটি আবার পরিশোধিত করব।

এশিয়া পোস্ট: বিগত আওয়ামী লীগ আমলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাজাকার এবং রাজাকারের তালিকা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে আসায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। ওই তালিকাটা ধরে বা এটাকে পুনর্বহাল করা হবে?

ইশরাক হোসেন: আমরা তিনটা তালিকা টার্গেট করে প্রাথমিকভাবে কাজ করছি। প্রথমত, কারা মুক্তিযোদ্ধা এবং কারা অমুক্তিযোদ্ধা সেই তালিকাটি ঠিক করতে হবে। এখন সম্ভবত ১ লাখ ৯৬ হাজারের বেশিসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেটভুক্ত হয়েছে। ইতিপূর্বে স্মার্ট কার্ড বিতরণ হয়েছে এবং এটা সংশোধন করতে হবে। এটা একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ। দ্বিতীয়ত, আমরা শহীদের সংখ্যা নিয়ে সঠিক তালিকা প্রণয়ন করতে চাই। যেন শহীদের তালিকা ও সংখ্যা নিয়ে কোনো বিতর্ক না থাকে। কারণ এটির জন্য গণহত্যা হিসেবে ৭১-এ যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি সেই প্রক্রিয়াটাও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তৃতীয়ত, বীরাঙ্গনাদের যে তালিকা রয়েছে সেটিও আমরা সঠিক করার চেষ্টা করছি। যদিও ৫৫ বছর পরে এসে এটা খুবই কঠিন। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগই জীবিত নেই। যারা জীবিত আছেন তারা প্রায় সবাই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে আছেন। এ ছাড়া মতবিনিময় সভা থেকে বাস্তুচ্যুতদের একটি তালিকা করার অনুরোধ এসেছে। একইসঙ্গে রাজাকারদের তালিকা সঠিকভাবে প্রণয়ন করা যায় কি না সেটাও খতিয়ে দেখছি।

এশিয়া পোস্ট: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে তাদের ছেলেসন্তানরা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি নিয়েছেন। তাদের বিষয়ে আপনার মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না?

ইশরাক হোসেন: আগে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটা ঠিক করতে হবে। তারপর কি কি পদক্ষেপ নিতে পারি সেটাকে ঠিক করার চেষ্টা থাকবে। যারা অমুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ও কোটায় চাকরি আছেন তাদের বিষয়ে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে একটা সিদ্ধান্তে তো পৌঁছাতে হবেই।

এশিয়া পোস্ট: আপনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদেরও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি উঠেছিল। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?

ইশরাক হোসেন: যখন এটা শুরু হয়, আমি অত্যন্ত ঘৃণাভরে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের ও মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছে খুনি হাসিনা সরকার; আমি এটাকে সমর্থন করি না।

এশিয়া পোস্ট: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে। বর্তমান সরকার এটা নিয়ে কী চিন্তাভাবনা করছে?

ইশরাক হোসেন: আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর ৭২ সাল থেকে এটাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ৭২ ও ৭৩ সালেও দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। আমরা এমন কোনো ইতিহাস চাই না। প্রথমে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, সেটা আমার কাছে গর্বের বিষয়। আমি চাই, সঠিক ইতিহাসটা তুলে ধরা হোক। যার যে সম্মান প্রাপ্য যেটা নিশ্চিত করা হোক।

এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করার কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এগুলো থেকে বেরিয়ে আসা বা মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা যারা বিদেশে মারা যায় অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দেশেও আসতে পারে না; সেটাকে নিয়ে কী পরিকল্পনা?

ইশরাক হোসেন: মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছনা করা হলে সেটার বিপক্ষে প্রতিবাদ জানিয়েছি রাজনৈতিক দল হিসেবে; এখন সরকারের থাকা অবস্থায় আমরা এটার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। যখন যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। যারা মুক্তিযোদ্ধাকে অসম্মান করবে বা মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে অস্বীকৃতি জানালে তো বাংলাদেশকে অস্বীকার করা হবে। যেসব রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিরা এটি করবে, আমরা রাজনৈতিক জায়গা থেকে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ জানাব এবং সরকারের থেকে আইনি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া বিদেশে মৃত্যুর আগে যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা দেশে আসতে চায়, তাহলে কাউকে বিগত সরকারের মতো কোনো অমানবিক আচরণ এই সরকার দেখাবে না। আমরা মানবিক আচরণ করব এবং আইনি কাঠামোর মধ্য থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেব।

নিজ দপ্তরে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নিজ দপ্তরে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে জাতিসংঘের পাঠানো তালিকা ও দেশের তালিকার মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এই বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

ইশরাক হোসেন: জাতিসংঘের ফাইন্ডিংস অনুযায়ী এক হাজার ৪০০ জন; আমাদের দলীয় সূত্র অনুযায়ী যেটা প্রধানমন্ত্রী সংসদে উল্লেখ করেছেন এই সংখ্যাটি দুই হাজারের কাছাকাছি হবে। যদিও এখন পর্যন্ত গেজেটে ৮৪৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পরবর্তীতে আমাদের রিপোর্টে উঠে এসেছে যারা আন্দোলনকারী নয় অন্য কোনোভাবে নিহত হয়েছিলেন তাদের কয়েকজনকে বাদও দেওয়া হয়েছে। অনেকের নাম হাসপাতালে শহীদের সঙ্গে যোগ হয়ে গিয়েছিল বা তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন অথবা তারা আন্দোলনের বিপক্ষে থেকে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটা বড়সংখ্যক যারা শহীদ হয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন ছিন্নমূল মানুষ ও পথশিশু; তাদের পরিবারের তেমন উল্লেখযোগ্য কেউ দাবি না করায় এটা মেলানো যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয় হলো, আহত জুলাইযোদ্ধাদের তালিকা আরও পূর্ণাঙ্গ করা। তবে এটা অনন্তকালের জন্য ছেড়ে দেওয়া যাবে না, যেটা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার ক্ষেত্রে হয়েছে। এ রকম কোনো পরিস্থিতি যাতে না হয় সে জন্য আমরা খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছি।

এশিয়া পোস্ট: আমরা যতটুক জানি, একাত্তরের সময় পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল এখন পর্যন্ত ভারতে আছে। সেখান থেকে এই দলিল ফেরত আনার কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখিনি। এই বিষয়ে আপনার কী চিন্তাভাবনা?

ইশরাক হোসেন: ভালো কথা স্মরণ করে দিলেন। আলোচনা করে দেখব, এই প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে আছে। আমরা কিছু করতে পারি কি না এবং এটার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারি কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।

এশিয়া পোস্ট: মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আপনি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। এর কারণ কী?

ইশরাক হোসেন: হ্যাঁ, প্রথমে আমাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আমরা যেন গণমাধ্যমে বেশি কথা না বলি। কারণ অতিকথার ফলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এটা আমাদের পার্লামেন্টারি গ্রুপের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, যেন আমরা গণমাধ্যমে কম কথা বলি।

এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

ইশরাক হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।