logo

সাক্ষাৎকারে নাঈম আবির/বিমানবন্দরে ভোগান্তি-অব্যবস্থাপনা, সমাধানে সুখবর নেই

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
বিমানবন্দরে ভোগান্তি-অব্যবস্থাপনা, সমাধানে সুখবর নেই
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক যাত্রীদের নানাবিধ অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব বনাম বাস্তবতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং এভিয়েশন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নিয়ে সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন ‘আলাপন’ অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন এভিয়েশনবিষয়ক সাংবাদিক নাঈম আবির।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এভিয়েশন খাত নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করছেন এবং সম্প্রতি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে ‘বাংলাদেশ পর্যটনবিষয়ক সাংবাদিকতা পুরস্কার’ অর্জন করেছেন। সঞ্চালনা করেছেন এশিয়া পোস্টের সম্পাদক পলাশ মাহমুদ।

এশিয়া পোস্ট: শুরুতেই আপনাকে শুভকামনা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা ও লাগেজ ভাঙা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়াতে দেখা গেছে। আপনার দীর্ঘ অনুসন্ধানী অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের ফাইন্ডিংসের আলোকে বাস্তবে সেখানে কী ঘটে? সত্যিই কি আমাদের বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা হয়?

নাঈম আবির: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা, লাগেজ ভাঙা, লাগেজ চুরি হওয়া কিংবা লাগেজ খুঁজে না পাওয়া নিয়ে নানাবিধ জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই আলোচনার সুবিধার্থে আমাদের দুটি দিক আলাদা করে বুঝতে হবে, একটি হলো জনমানসের ধারণা বা পাবলিক পারসেপশন, আর অন্যটি হলো মাঠপর্যায়ের প্রকৃত বাস্তবতা। আমি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিমানবন্দর ও এভিয়েশন খাত নিয়ে নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছি। লাগেজ ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্রটি বুঝতে হলে খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে যে, ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্রটি কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। এটি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, উড়োজাহাজ অবতরণের ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রথম লাগেজটি বেল্টে পৌঁছাতে হবে এবং ৪০ মিনিটের মধ্যে সব লাগেজ ডেলিভারি শেষ করতে হবে। অর্থাৎ পুরো লাগেজ খালাস করার জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ২৫ মিনিট সময় পায়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলোর সেবার মান এই ৪০ মিনিটের নির্দেশক দিয়েই পরিমাপ করা হয়।

এখন আসি প্রথম ঘটনাটিতে। আনুমানিক দুই-তিন মাস আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি খবর ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয় যে, ঢাকা বিমানবন্দরে ১৫০ জন হাজির লাগেজ কেটে ফেলা হয়েছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়। আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করতে গিয়ে সাধারণ বুদ্ধি বা কমনসেন্স প্রয়োগ করলাম। ১৫০ জন হাজির মোট লাগেজের সংখ্যা অন্তত ৮০০ থেকে ১,০০০টি। ঢাকা বিমানবন্দরে কোনো উড়োজাহাজ ল্যান্ড করার পর লাগেজ অফলোড করে বেল্টে ফেলা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২০ জন কর্মী কাজ করেন। এই অল্প সময়ে ২০ জন কর্মীর পক্ষে ৮০০ লাগেজের মধ্য থেকে বেছে বেছে ১৫০ বা ২০০টি লাগেজ কেটে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

পরবর্তীতে আমি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখলাম, উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ অফলোড করে যে কন্টেইনারে করে বেল্টের দিকে আনা হয়েছিল, লাগেজগুলো সেই কনটেইনার থেকেই কাটা অবস্থায় বের হচ্ছিল। এমনকি সিসিটিভিতে দেখা যায়, কর্মীরা কনটেইনার থেকে কাটা লাগেজ বের করে চেইন লাগানোর চেষ্টা করছেন এবং পরে বেল্টে ফেলছেন। অনুসন্ধানে জানা গেল, ওই ফ্লাইটটি ছিল ওমরাহ হাজীদের। ৮০০ লাগেজের মধ্যে ২১ থেকে ২২টি লাগেজ কাটা পাওয়া যায়। আর এই ঘটনাটি ঘটেছিল সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দরে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী লাগেজে জমজমের পানি বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমাদের ওই ২১-২২ জন যাত্রী তাদের লাগেজে জমজমের পানি রেখেছিলেন। জেদ্দা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন স্ক্রিনিংয়ে যখন পানির বোতল ধরা পড়ে, তখন যাত্রী ইমিগ্রেশন পার হয়ে চলে যাওয়ায় উড়োজাহাজ ছাড়ার সময় বাঁচাতে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তালা কেটে বা চেইন ছিঁড়ে পানির বোতলগুলো বের করে রেখে লাগেজ পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে যোগাযোগ করা হলে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠির জবাবে এই তথ্য নিশ্চিত করে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছরের শেষের দিকে, ৭৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশিকে কেন্দ্র করে। তাদের লাগেজ কাটা ও মালামাল হারানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিমানবন্দরের লাগেজ বেল্ট এলাকায় হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে এবং ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রবাসীরা সৌদি আরব থেকে আউটপাস নিয়ে একটি ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আদ্দিস আবাবা হয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। তাদের কারোরই পাসপোর্ট ছিল না, তারা মূল অপরাধী হিসেবে জেলে ছিলেন অথবা আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ায় আউটপাস পেয়েছিলেন।

সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী, আউটপাসধারী যাত্রীদের ব্যক্তিগত কোনো পৃথক লাগেজ বহন করতে দেওয়া হয় না, বেশ কয়েকজনের মালপত্র একসঙ্গে করে অল্প কিছু হ্যান্ড ক্যারিজ হিসেবে দেওয়া হয়। ৭৮ জনের জন্য তারা হয়তো ৪০টি ব্যাগ মিক্স করে দিয়েছিল। ফলে তারা ঢাকায় এসে নিজেদের পূর্ণাঙ্গ লাগেজ না পেয়ে এবং দু-একটি মোবাইল হারিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ও এয়ারপোর্ট কর্মীদের ওপর চড়াও হন। এখানেও মূল ঘটনা ঘটেছিল জেদ্দা বিমানবন্দরে, ঢাকায় নয়।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কি ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা হয় না? আমি সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, গত এক বছরের মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ কাটার সুযোগ ৯৯.৯৯ শতাংশও নেই। এর কারণ হলো, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের শতভাগ কর্মীকে ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ (Body-worn camera) দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী ফুটবল দল সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরার পর লাগেজসংক্রান্ত ঘটনার পর থেকে পুরো লাগেজ চলাচলের পথটি ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার নিখুঁত আওতায় আনা হয়েছে।

তবে এটি সত্য যে, ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ ভাঙার ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর লাগেজ ভাঙার মূল কারণ হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একচ্ছত্র আধিপত্য বা মনোপলি ব্যবসা। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৫ বছর ধরে দেশের আটটি বিমানবন্দরে একমাত্র রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে আসছে। তাদের কোনো প্রতিযোগী নেই। বাজার প্রতিযোগিতামূলক না হলে সেবার মান কখনোই ভালো হয় না। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও হজ ফ্লাইট, এই দুটি খাত থেকে বিমান প্রতিবছর প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা লাভ করে। কিন্তু একচ্ছত্র সুযোগ থাকায় বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে না। লাগেজ অফলোড করার সময় ট্রলি বা কন্টেইনার থেকে কর্মীরা লাগেজ যত্নসহকারে না রেখে বেল্টের ওপর ছুড়ে ফেলেন। ফলে প্লাস্টিক ও ভঙ্গুর লাগেজগুলো সহজে ভেঙে যায়। ২০২৫ সালে লাগেজের ব্যাপারে বিমানের কাছে ১,৩০০টির বেশি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অথচ বিমান কর্তৃপক্ষ মাত্র ১০ থেকে ১৫টি অভিযোগ তদন্ত করেছে এবং কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় কর্মীরা লাগেজ ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত কেয়ারলেস বা অসাবধান আচরণ করেন।

এশিয়া পোস্ট: বিদেশ থেকে আসার পর অনেক যাত্রীকে লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় আমাদের দেশে লাগেজ পেতে এত দেরি হওয়ার কারণ কী?

নাঈম আবির: আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ১৫ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে লাগেজ পাওয়া উচিত। উন্নত বা বড় বিমানবন্দরগুলোতে উড়োজাহাজ থেকে নেমে ইমিগ্রেশন পার হয়ে লাগেজ বেল্টে পৌঁছাতেই যাত্রীদের ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লেগে যায়। কারণ সেখানে দূরত্বের পাশাপাশি শাটল ট্রেন ব্যবহার করতে হয় এবং ইমিগ্রেশনের আঁকাবাঁকা দীর্ঘ লাইন পার হতে হয়। ফলে যাত্রীরা যখন বেল্টে পৌঁছান, ততক্ষণে লাগেজ ডেলিভারি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ঢাকা বিমানবন্দর আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় যাত্রীরা বিমান থেকে নেমে মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে চলে আসেন। তখনো উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ অফলোড করাই শেষ হয় না। অর্থাৎ লাগেজ ডেলিভারির ১৫ মিনিটের নির্ধারিত সময় শুরু হওয়ার আগেই যাত্রী বেল্টে দাঁড়িয়ে যান, ফলে ২০-৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাকে তাদের কাছে দেড়-দুই ঘণ্টার মতো মনে হয়। সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে চলে আসে, তবে বাকি অংশ পেতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে।

এখানে আরেকটি প্রযুক্তিগত দিক রয়েছে, যাকে এভিয়েশনের ভাষায় বলা হয় ‘লাগেজ লেফট বিহাইন্ড’। অনেক সময় উড়োজাহাজে অতিরিক্ত ওজন বা জায়গার স্বল্পতার কারণে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট ফ্লাইটে সব লাগেজ আনতে পারে না। বিশেষ করে বাজেট ক্যারিয়ারগুলোতে এটি বেশি ঘটে। এটি আইকাও নিয়মানুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ এবং পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে কুরিয়ারে যাত্রীর ঠিকানায় বিনামূল্যে লাগেজ পৌঁছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনেক যাত্রী বিমানবন্দর নেমেই লাগেজ না পেয়ে কারণ না জেনে ক্ষুব্ধ হয়ে লাইভ করে ফেলেন এবং বিভ্রান্তি ছড়ান।

তবে লাগেজ পেতে দেরির মূল কারণ হলো আমাদের ভয়াবহ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ১৯৮০-র দশকে নির্মিত ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৮০ লাখ। অথচ ২০২৫ সালে এই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছে ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী! অর্থাৎ সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৪৭ লাখ অতিরিক্ত যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করছে। প্রতিদিন এখানে ৩০০টির বেশি ফ্লাইট ওঠানামা করে। পিক আওয়ারে যখন একসঙ্গে একাধিক বড় ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ ল্যান্ড করে, তখন মাত্র ৭টি সচল লাগেজ বেল্ট দিয়ে হাজার হাজার মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী যাত্রীদের সুবিশাল লাগেজ সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটি উড়োজাহাজের লাগেজ খালাস হয়ে বেল্ট ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত অন্য উড়োজাহাজের লাগেজ আনা যায় না। অবকাঠামোর এই সংকটের কারণেই মূলত যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এশিয়া পোস্ট: বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়ে যাত্রীদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। এ ছাড়া কোটি কোটি টাকা খরচে বসানো ই-গেটগুলো কেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে?

নাঈম আবির: আমাদের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশ বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়। সেখানে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের রোটেশন ভিত্তিতে ৬ মাস বা ১ বছরের জন্য প্রাক্কলনে এনে বসানো হয়। উন্নত বিশ্বে কিংবা প্রতিবেশী ভারতেও বিমানবন্দরে ডেডিকেটেড ও স্থায়ী ইমিগ্রেশন পুলিশ বা অথরিটি থাকে, যারা আজীবন বিমানবন্দরেই কাজ করেন এবং যাত্রীবান্ধব আচরণে দক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু আমাদের দেশে থানা থেকে এসে পুলিশ সদস্যরা ইমিগ্রেশনে বসেন, যারা কাজ শিখতে শিখতেই বদলি হয়ে যান। ফলে তাদের মধ্যে বিমানবন্দর সুলভ সামাজিকীকরণ বা পেশাদার আচরণের ঘাটতি থাকে।

তবে ইমিগ্রেশনে কড়াকড়ির পেছনে আমাদের দেশের কিছু যাত্রীর জাল কাগজপত্র ব্যবহারের প্রবণতাও দায়ী। ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে যাওয়ার কারণে মালয়েশিয়া ও ইতালির মতো দেশে আমাদের শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে এবং কানাডায় বিমান বাংলাদেশকে জরিমানা গুনতে হয়েছে। এই কারণে ইমিগ্রেশন অফিসারদের অতিরিক্ত সতর্ক হতে হয়। কোনো বৈধ যাত্রী যদি জুনিয়র ইমিগ্রেশন কর্মীদের দ্বারা অহেতুক হয়রানির শিকার হন, তবে আমার পরামর্শ থাকবে তাদের সঙ্গে তর্ক না করে সরাসরি ইমিগ্রেশন ইনচার্জ বা ওসির সাথে কথা বলা। অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা কাগজপত্র দেখে দ্রুত সমাধান করে দেন।

আর ই-গেটের কথা বলতে গেলে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে ১২টি আধুনিক ই-গেট উদ্বোধন করা হয়েছিল। এটি চালু থাকলে একজন যাত্রী ই-পাসপোর্ট স্ক্যান করে মাত্র ৩০ সেকেন্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমিগ্রেশন পার হতে পারতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দক্ষ জনবলের অভাব, প্রযুক্তিগত মেইনটেন্যান্স না থাকা এবং সে সময় পর্যাপ্ত ই-পাসপোর্টের ব্যবহার না থাকার কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ই-গেটগুলো এখন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে।

এশিয়া পোস্ট: কিছুদিন আগে বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এখন খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টাঙিয়ে হাজার হাজার টন আমদানিকৃত মালামাল রাখা হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কেন এমন নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হলো?

নাঈম আবির: এখানে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (সিএএবি) এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও দায় এড়ানোর মানসিকতা স্পষ্ট। ঢাকা বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও বিল্ডিংয়ের মালিক হলো সিভিল এভিয়েশন, কিন্তু প্যাসেঞ্জার ও কার্গো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনা করে বিমান। কার্গো টার্মিনালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কোনো সংস্থাই ঘটনার দায় নেয়নি। ফায়ার সার্ভিসের ডিরেক্টর ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ওই কার্গো ভিলেজে কোনো কার্যকর ফায়ার ডিটেক্টর বা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের অগ্নিনির্বাপক সক্ষমতা কেবল রানওয়ে ও উড়োজাহাজের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল, ভবনের জন্য নয়।

ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ টন কার্গো (৫০০ টন আমদানি ও ৫০০ টন রপ্তানি) পরিচালিত হয়। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো ভিলেজের মাত্র ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সংস্কার করা হয়েছে। স্থায়ী কোনো আধুনিক অবকাঠামো তৈরি না করে সাময়িকভাবে ত্রিপল ও ছাউনি টাঙিয়ে মালামাল রাখা হচ্ছে। পোশাক খাতের সংগঠন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ নিজস্ব অর্থায়নে সহায়তা করলেও বছরের পর বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত মালামাল অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল থার্ড টার্মিনালের নতুন কার্গো ভিলেজ চালু হলে সেখানে শিফট করা হবে, কিন্তু থার্ড টার্মিনাল চালু হতে দেরি হওয়ায় এই মধ্যবর্তী সময়ে আমদানিকারকদের চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের এসব সংকট কি পুরোপুরি কেটে যাবে?

নাঈম আবির: থার্ড টার্মিনাল নিয়ে আমরা যে আশাবাদ প্রকাশ করছি, তার বাস্তব চিত্র বেশ উদ্বেগের। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা (পরবর্তীতে আরও ২,৩০০ কোটি টাকা অনুমোদিত) ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালটির বার্ষিক যাত্রী হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ১ কোটি ২০ লাখ। বর্তমানের ৮০ লাখ আর নতুন ১ কোটি ২০ লাখ মিলিয়ে মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ২ কোটিতে।

অথবা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রী সংখ্যা দাঁড়াবে আড়াই কোটিতে। এদিকে থার্ড টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হতে ২০২৭ সালের জুন মাস লেগে যাবে। অর্থাৎ ২০২৭ থেকে ২০৩৫, মাত্র ৫ থেকে ৭ বছরের জন্য আমরা এই টার্মিনালে কিছুটা স্বস্তি পাব। এর পর এটি আবারও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোডে পড়ে বর্তমানের মতো ভয়াবহ ভোগান্তি তৈরি করবে। যেখানে বিশ্বজুড়ে ১৫,০০০ কোটি টাকায় রানওয়েসহ একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা যায়, সেখানে আমরা রানওয়ে ছাড়াই শুধু একটি টার্মিনাল তৈরি করেছি ২২ হাজার কোটি টাকায়।

সবচেয়ে বড় চরম অপরিকল্পনা হলো রানওয়ে সংকট। বর্তমানে প্রতিদিন ৩০০টি ফ্লাইটের জন্য মাত্র একটি রানওয়ে ব্যবহার করতেই উড়োজাহাজগুলোকে আকাশে ২০ থেকে ৩০ মিনিট চক্কর দিতে হয়, যা প্রচুর মূল্যবান জ্বালানি অপচয় করে। থার্ড টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা ব্যবহার করতে হলে প্রতিদিন অন্তত ৪০০টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে হবে। একক রানওয়ে দিয়ে ৪০০ ফ্লাইট সামাল দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। ফলে রানওয়েতে উড়োজাহাজের জটলা এবং আকাশে হোল্ডিং টাইমের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি কমার বদলে আরও বৃদ্ধি পাবে।

এশিয়া পোস্ট: বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট ও অব্যবস্থাপনার মূল কারণ কী? এর কি কোনো স্থায়ী সমাধান নেই?

নাঈম আবির: বর্তমানে ঢাকা বিমানবন্দরে প্রায় ৩৫০০ থেকে ৪০০০ ট্রলি রয়েছে। এখানে প্রকৃত সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হলো সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব। একজন যাত্রী ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে আসার আগেই একটি ট্রলি দখলে নিয়ে বসে থাকেন এবং লাগেজ পেতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লেগে যাওয়ায় সেই ট্রলিটি আটকে থাকে।

এ ছাড়া বিমানবন্দরে ট্রলি জমা রাখার নির্দিষ্ট কোনো ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ পয়েন্ট নেই। সিভিল এভিয়েশনের ভয়ে ট্রলি পার্কিং এলাকা বা ক্যানোপির বাইরে নেওয়া নিষেধ, ফলে যাত্রীদের মালামাল কাঁধে করে গাড়িতে তুলতে হয়। সম্প্রতি এয়ারপোর্টে তল্লাশি চালিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রায় ১০০টিরও বেশি ভালো ট্রলি পরিত্যক্ত অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছিল। নভেম্বরের মধ্যে আরও ১,০০০ নতুন ট্রলি বহরে যুক্ত হলে কিছুটা সুফল মিলবে, তবে মূল পরিবর্তন আনতে হবে ট্রলি পরিচালন ব্যবস্থাপনায়।

এশিয়া পোস্ট: এভিয়েশন খাতে পাইলট নিয়োগ ও লাইসেন্স প্রদান নিয়ে নানা অনিয়মের কথা শোনা যায়। বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক পাইলটদের প্রশিক্ষণের পার্থক্য এবং এ খাতের দুর্নীতির বাস্তব চিত্র কেমন?

নাঈম আবির: আমাদের দেশে দক্ষ পাইলটের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। দেশীয় ফ্লাইং স্কুলগুলো থেকে বছরে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন পাইলট বের হন, অথচ প্রতিবছর প্রয়োজন ৫০ থেকে ৬০ জন। বর্তমানে বিমানসহ বিভিন্ন বেসরকারি এয়ারলাইন্স প্রায় ৫০টির মতো নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু সেই অনুপাতে দক্ষ পাইলট, প্রকৌশলী বা কেবিন ক্রু নেই।

এই সংকট মেটাতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী বা বিজিবির এভিয়েশন থেকে আসা সাবেক সামরিক পাইলটদের সিভিল এভিয়েশনে সুযোগ দেওয়া হয়। তবে সামরিক ও বেসামরিক এভিয়েশনের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশিক্ষণের বড় পার্থক্য রয়েছে। সামরিক পাইলটদের প্রশিক্ষণ হয় আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বেসামরিক এভিয়েশনে যাত্রী নিরাপত্তা, সেবা ও কেয়ারিং মনোভাব মুখ্য। ফ্লাইং স্কুল থেকে আসা সিভিলিয়ান পাইলটদের কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) পেতে ১৫০ ঘণ্টা ফ্লাইং টাইমের প্রয়োজন হলেও নন-একাডেমি বা সামরিক পাইলটদের জন্য নিয়ম হলো ২০০ ঘণ্টা ফ্লাইং টাইম। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক সামরিক পাইলটের লাইসেন্সে উড়োজাহাজ চালানোর এই ২০০ ঘণ্টার শর্ত পূরণ ছিল না। সিভিল এভিয়েশনের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাপ্রাপ্তির কারণে তাদের অনিয়মিতভাবে লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে অতীতে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের এভিয়েশন খাতকে সুশৃঙ্খল ও যাত্রীবান্ধব করতে কী কী প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন?

নাঈম আবির: আমাদের বিমানবন্দর পরিচালনার মূল কাঠামোর মধ্যেই গলদ রয়েছে। আইকাও-এর স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি কেবল একটি ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা’ (Regulator) হিসেবে নীতি নির্ধারণ, নজরদারি ও শাস্তি বা পুরস্কার প্রদান করবে। আর বিমানবন্দর পরিচালনা ও সেবার দায়িত্ব থাকবে একটি পৃথক ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি’ বা দক্ষ বেসরকারি সংস্থার হাতে। কিন্তু বাংলাদেশে সিভিল এভিয়েশন নিজেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নিজেই ৮টি বিমানবন্দর পরিচালনা করে। ফলে তারা নিজেদের সেবার ব্যর্থতা ও অপরাধ নিজেরাই ঢেকে রাখে।

এ ছাড়া বিমানবন্দরে পুলিশ, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, ডিজিএফআই, এনএসআই, আনসার, এপিবিএন, সিভিল এভিয়েশনসহ প্রায় ২৫ থেকে ২৬টি সংস্থা কাজ করে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো প্রশাসনিক সমন্বয় নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তা সিভিল এভিয়েশন বা এয়ারপোর্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের কোনো আদেশ মানতে বাধ্য থাকেন না, তিনি চলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। কাস্টমস চলে এনবিআরের নির্দেশে। ফলে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

এভিয়েশন খাতকে সুশৃঙ্খল করতে হলে অবিলম্বে চারটি মৌলিক কাজ করতে হবে:

১. সিভিল এভিয়েশনকে (CAAB) কেবল একটি শক্তিশালী নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে রাখতে হবে এবং বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব একটি পৃথক স্বাধীন ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি’ বা বিদেশি দক্ষ সংস্থাকে লিজ দিয়ে হস্তান্তর করতে হবে। ২. বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতের একচ্ছত্র আধিপত্য (মনোপলি) অবিলম্বে ভেঙে দিতে হবে। থার্ড টার্মিনালে বিমানের পাশাপাশি মেনজিস বা ডানাতার মতো বিশ্বমানের বিদেশি সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়ে ৫০-৫০ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. বিমানবন্দরে কর্মরত ২৫টি সংস্থাকে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে না দিয়ে সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান বা এয়ারপোর্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের একক প্রশাসনিক কমান্ডের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। ৪. রানওয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই মৌলিক প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো না আনলে থার্ড টার্মিনাল কেন, ফিফথ টার্মিনাল করলেও দেশের বিমানযাত্রীদের ভোগান্তি কখনোই দূর হবে না।