সকালে ঘুম ভাঙতেই বমিভাব হতে পারে যেসব কারণ

সকালে ঘুম থেকে উঠেই অনেকের অস্বস্তি লাগে, কারও আবার বমি বমি ভাব হয়। অনেকেই এটিকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। আবার অনেক নারীই মনে করেন এটি শুধু গর্ভাবস্থার লক্ষণ।
কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সকালের বমিভাবের পেছনে ঘুমের সমস্যা, অ্যাসিডিটি, মানসিক চাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শারীরিক কারণও থাকতে পারে। তাই এই উপসর্গ বারবার হলে কারণ জানা গুরুত্বপূর্ণ।
বমিভাব বা নসিয়া এমন একটি অনুভূতি, যখন মনে হয় বমি হতে পারে। এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, পেটব্যথা বা ঘামও থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় এটি সাময়িক হলেও কখনও শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার সংকেত হতে পারে।
গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে বমিভাব খুব সাধারণ একটি উপসর্গ। সাধারণত গর্ভধারণের ৬ সপ্তাহের দিকে এটি শুরু হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস পর কমে যায়। যদিও একে মর্নিং সিকনেস বলা হয়, এটি দিনের যেকোনো সময় হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া: রাত জাগা, অনিদ্রা বা ঘুমের অনিয়ম শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলে। এর ফলে সকালে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা বমিভাব হতে পারে।
খালি পেট থাকা: রাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে সকালে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যেতে পারে। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও বমিভাব দেখা দিতে পারে। যারা নিয়মিত সকালের নাশতা এড়িয়ে যান, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
অ্যাসিডিটি বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স: পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে এলে বমিভাব হতে পারে। এর সঙ্গে বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর বা কাশিও থাকতে পারে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এই সমস্যা বেশি অনুভূত হতে পারে।
সাইনাসের সমস্যা: নাক বন্ধ বা পোস্টনেজাল ড্রিপের কারণে ভেতরের কানে চাপ তৈরি হলে মাথা ঘোরা ও বমিভাব দেখা দিতে পারে।
উদ্বেগ ও মানসিক চাপ: মানসিক চাপের প্রভাব অনেক সময় সরাসরি পেটে অনুভূত হয়। গুরুত্বপূর্ণ কাজ, পরীক্ষা বা দীর্ঘদিনের উদ্বেগ থেকেও সকালে বমিভাব হতে পারে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল: আগের রাতে অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে পরদিন সকালে হ্যাংওভারের কারণে বমিভাব হতে পারে। এতে শরীরে পানিশূন্যতাও ভূমিকা রাখে।
হজমের সমস্যা: অতিরিক্ত খাওয়া, খাবারে অ্যালার্জি বা হজমের গোলমাল থেকেও সকালে অস্বস্তি হতে পারে। আগের রাতে খাওয়া কোনো খাবারের প্রতিক্রিয়াও সকালে দেখা দিতে পারে।
গ্যাস্ট্রোপেরেসিস: এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে পাকস্থলীর পেশি ঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে খাবার পাকস্থলীতে বেশি সময় থেকে যায় এবং বমিভাব, পেটব্যথা বা হজমে সমস্যা দেখা দেয়।
পিত্তথলির পাথর: গলব্লাডারে পাথর হলে তীব্র পেটব্যথার সঙ্গে বমিভাব ও বমি হতে পারে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, শক্তিশালী ব্যথানাশক বা কেমোথেরাপির ওষুধ থেকেও বমিভাব হতে পারে।
মাথায় আঘাত: মাথায় আঘাত পাওয়ার পর যদি বমিভাব বা বমি হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ফুড পয়জনিং: দূষিত খাবার বা পানি খেলে বমিভাবের পাশাপাশি ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও বমি হতে পারে।
গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস: ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে পাকস্থলী ও অন্ত্রে প্রদাহ তৈরি হলে বমিভাব দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা: ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস নামের গুরুতর অবস্থায় বমিভাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়।
কোষ্ঠকাঠিন্য: দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে হজম ধীর হয়ে বমিভাব তৈরি হতে পারে।
মোশন সিকনেস: গাড়ি, নৌকা বা বিমানে যাতায়াতের সময় শরীরের ভারসাম্যে সমস্যা হলে বমিভাব হতে পারে। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
কীভাবে কমানো যায় সকালের বমিভাব
কিছু সাধারণ অভ্যাস এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে। যেমন-
- সকালে উঠে অল্প কিছু খাওয়া
- নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা
- রাতে অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল কমানো
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-
- দীর্ঘদিন বমিভাব থাকা
- ওজন কমে যাওয়া
- তীব্র পেটব্যথা
- বারবার বমি হওয়া
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা
সকালের বমিভাব সবসময় সাধারণ বিষয় নয়। এটি ঘুমের সমস্যা, হজমের গোলমাল, মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। তাই উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
সূত্র: হেল্থলাইন