
সকালে ঘুম ভাঙার পর বুকের ভেতরে জ্বালাপোড়া, টক ঢেঁকুর বা পেটের অস্বস্তি অনেকের জন্যই এখন একটি পরিচিত সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহুরে কর্মজীবী মানুষের মধ্যে এই সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি শুধু সাধারণ অ্যাসিডিটি নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা IBS নামের একটি দীর্ঘমেয়াদি হজমজনিত সমস্যা।
এই সমস্যা এখন নীরব কিন্তু বড় একটি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কাজের অনিয়মিত সময়, মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত প্রসেসড খাবারের ওপর নির্ভরতা মিলিয়ে আধুনিক জীবনের অভ্যাস মানুষের হজমতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ইন্ডিয়ান জার্নাল অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শহুরে জনসংখ্যার মধ্যে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের হার প্রায় ৪ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী কর্মজীবী মানুষরা।
এই রোগে সাধারণ আলসারের মতো দৃশ্যমান ক্ষত দেখা যায় না। বরং এটি অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচলকে প্রভাবিত করে। ফলে কখনও হজম খুব দ্রুত হয়, আবার কখনও খুব ধীর হয়ে যায়।
দিল্লির সিনিয়র গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. অঙ্কুর জৈন জানান, অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার, রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ এবং বেশি ক্যাফেইন গ্রহণের কারণে হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য গ্যাস বা স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়াকেও শরীর অতিরিক্ত ব্যথা হিসেবে অনুভব করে। এতে পেটে ফাঁপা, খিঁচুনি এবং অনিয়মিত মলত্যাগ দেখা দেয়।
মানুষের মস্তিষ্ক ও হজমতন্ত্রের মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলা হয় গাট ব্রেইন অ্যাক্সিস। এর মাধ্যমে মানসিক চাপ সরাসরি হজমের ওপর প্রভাব ফেলে।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বড় শহরের আইটি হাব ও কর্পোরেট অঞ্চলে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম রোগীদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ উদ্বেগ, দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস এবং ঘুমের সমস্যায় ভোগেন।
মানসিক চাপ বাড়লে শরীরে কর্টিসল নামের হরমোন বেড়ে যায়। এটি পাকস্থলীর স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া ধীর করে দেয় এবং অন্ত্রের সংকোচন অস্বাভাবিক করে তোলে।
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. স্মিতা শর্মা বলেন, অন্ত্রকে প্রায় দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ অন্ত্রের প্রাচীরকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এতে সামান্য খাবার খেলেও অস্বস্তি, ব্যথা বা ফাঁপার অনুভূতি হতে পারে, এমনকি খাবার ভালো হলেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টাসিড বা ওষুধের ওপর নির্ভর না করে জীবনযাত্রার পরিবর্তন করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী খাবার হজমজনিত সমস্যায় ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং মেডিকেল জার্নালে দইয়ের ঘোল বা বাটারমিল্ককে একটি কার্যকর প্রোবায়োটিক পানীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণ দুধের তুলনায় বাটারমিল্ক সহজে হজম হয়। এতে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং খাদ্যনালীর জ্বালাপোড়া কমাতে সহায়তা করে।
এছাড়া এতে থাকা প্রোবায়োটিক উপাদান অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা হজম প্রক্রিয়াকে আরও স্থিতিশীল করে।
আধা কাপ টাটকা দই এক কাপ পরিষ্কার পানির সঙ্গে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। এতে সামান্য ভাজা জিরা গুঁড়া মেশান, যা হজম এনজাইম সক্রিয় করতে সাহায্য করে। স্বাদ ও ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যের জন্য এক চিমটি কালো লবণ যোগ করুন
এটি ঠান্ডা না করে হালকা ঠান্ডা অবস্থায় পান করা সবচেয়ে উপকারী।
যদি পেটে তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত ফাঁপা, ওজন কমে যাওয়া, রাতে বারবার ডায়রিয়া বা মলে রক্ত দেখা যায়, তবে শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সঠিক জীবনযাপন, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পানীয় যেমন বাটারমিল্ক নিয়মিত গ্রহণ করলে হজমতন্ত্র অনেকাংশে সুস্থ রাখা সম্ভব।
সূত্র: এনডিটিভি