চকলেট খেতে ইচ্ছা করছে বারবার, হতে পারে শরীরের কোনো ঘাটতির ইঙ্গিত

বিকেলের ক্লান্তি, মানসিক চাপ কিংবা নারীদের মাসিকের আগে হঠাৎ করেই চকলেট খেতে ইচ্ছে করে অনেকের। কেউ কেউ এটিকে শুধু মিষ্টি খাওয়ার লোভ বলে মনে করেন। কিন্তু পুষ্টিবিদরা বলছেন, বারবার চকলেট খাওয়ার ইচ্ছা অনেক সময় শরীরের কিছু প্রয়োজনের ইঙ্গিতও হতে পারে।
শরীর সাধারণত কোনো কারণ ছাড়া বারবার একই ধরনের খাবার চাইতে শুরু করে না। তাই চকলেটের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
চলুন জেনে নিই কী কী কারণে আমাদের চকলেট খেতে ইচ্ছে করে।
ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হতে পারে একটি কারণ
চকলেট, বিশেষ করে কোকোতে রয়েছে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম। এই খনিজ উপাদান শরীরের শত শত গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। এটি পেশি শিথিল রাখতে, স্নায়ুর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করে।
পুষ্টিবিদ মুগ্ধা প্রধানের মতে, শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে মানুষ দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্য কিছু খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তখন চকলেট একটি সহজ পছন্দ হয়ে ওঠে।
এ কারণেই অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ক্লান্তি বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব থাকলে চকলেট খাওয়ার ইচ্ছা আরও বেড়ে যেতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তনও দায়ী হতে পারে
নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের ওঠানামা চকলেটের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মাসিকের আগের সময় বা মেনোপজের আগের পর্যায়ে শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের পরিবর্তন ঘটে।
এতে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা প্রভাবিত হতে পারে। সেরোটোনিনকে সাধারণত ভালো লাগার অনুভূতির রাসায়নিক বলা হয়। চকলেট সাময়িকভাবে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মাত্রা বাড়িয়ে মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।
তাই অনেক সময় এই চাহিদা ক্ষুধার কারণে নয়, বরং মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন থেকেও তৈরি হয়।
রক্তে শর্করার ওঠানামার ইঙ্গিত
খাবারে যদি পর্যাপ্ত প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি না থাকে এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট থাকে, তাহলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে এবং পরে দ্রুত কমে যায়।
এই অবস্থায় মস্তিষ্ক দ্রুত শক্তির উৎস খুঁজতে থাকে। ফলে চকলেটের মতো মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। যদিও এটি সাময়িক স্বস্তি দেয়, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করে না।
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
চকলেটের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের পেছনে অন্ত্রের স্বাস্থ্যও ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্ত্রে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়া চিনি জাতীয় খাবার পছন্দ করে। এসব ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে মস্তিষ্কে এমন সংকেত যেতে পারে, যা মিষ্টি খাবারের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়।
অন্ত্রের কার্যকারিতা ঠিক না থাকলেও বিভিন্ন ধরনের খাবারের প্রতি আকস্মিক আকর্ষণ দেখা দিতে পারে।
সব সময় চকলেট খেতে ইচ্ছে করলে কী বোঝায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব সময় চকলেট খেতে ইচ্ছে করা মানেই শরীরের চকলেট প্রয়োজন- বিষয়টা এমন নয়। বরং এটি অনেক সময় সুষম পুষ্টির ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।
পর্যাপ্ত প্রোটিন, খনিজসমৃদ্ধ খাবার এবং নিয়মিত সময়ে খাবার খেলে এসব আকাঙ্ক্ষা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
এছাড়া বাদাম, বিভিন্ন বীজ, ডিম, মাছ, মুরগির মাংস এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
ডার্ক চকলেট কি শরীরের জন্য ভালো
সব ধরনের চকলেট এক নয়। চকলেট খেতে ইচ্ছে করলে বেশি কোকোসমৃদ্ধ ডার্ক চকলেট তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। ৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকলেটে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল, যা হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়।
তবে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন চকলেট মানসিক চাপ মোকাবিলার নিয়মিত উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
রাতে চকলেট খেতে ইচ্ছে করে কেন
অনেকের রাতের দিকে চকলেট খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা হয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। রাতের খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকা, দিনের বেলায় প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া বা ঘুমের অনিয়ম এর জন্য দায়ী হতে পারে।
আবার বিকেল বা সন্ধ্যায় চকলেটের প্রতি আকর্ষণ অনেক সময় মানসিক চাপ, অবসাদ বা অতিরিক্ত ক্লান্তির ইঙ্গিতও হতে পারে।
চকলেটের চাহিদাকে কীভাবে দেখবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের প্রতি আকস্মিক আকর্ষণকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে শরীরের একটি বার্তা হিসেবে দেখা উচিত। চকলেট খেতে ইচ্ছে করলে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, আসলে শরীর কী চাইছে? পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ভালো ঘুম, সুষম খাবার, খনিজের ঘাটতি পূরণ নাকি মানসিক স্বস্তি?
মূল কারণগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করা গেলে অতিরিক্ত চকলেট খাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে। তখন চকলেট শুধু উপভোগের খাবার হিসেবেই থাকে, অভ্যাস বা বাধ্যতামূলক চাহিদা হিসেবে নয়।
সূত্র: হেল্থ শটস