তেতো পানীয় থেকে যেভাবে মিষ্টি হলো চকলেট

তেতো পানীয় থেকে যেভাবে মিষ্টি হলো চকলেট
আধুনিক চকলেট তৈরির প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার ফলে কঠিন বা বার আকারের চকলেট তৈরি সম্ভব হয়। ছবি : সংগৃহীত

আজকের চকলেট মানেই মিষ্টি স্বাদ, দারুণ ঘ্রাণ আর ছোট-বড় সবার প্রিয় একটি খাবার। কিন্তু জানেন কি, হাজার হাজার বছর আগে চকলেট মোটেও এমন ছিল না? তখন এটি ছিল কোকো বীজ, পানি ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি এক তেতো পানীয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং রাজা, যোদ্ধা ও বিশেষ অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন উপাদান, প্রযুক্তি এবং মানুষের রুচির পরিবর্তনে সেই তেতো পানীয়ই ধীরে ধীরে রূপ নেয় আজকের পরিচিত মিষ্টি চকলেটে। এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, নানা সভ্যতার অবদান এবং চমকপ্রদ কিছু ঘটনা। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে তেতো পানীয় থেকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হলো চকলেট এবং এ নিয়ে কিছু দারুণ মজার তথ্য।

চকলেটের মূল উপাদান আসে কোকো গাছের ফল থেকে। এই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম থিওব্রামো কাকাও (Theobroma cacao)। গ্রিক ভাষায় থিওব্রামো শব্দের অর্থ হলো দেবতাদের খাবার।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকার অলমেক সভ্যতার মানুষ প্রথম কোকো ব্যবহার শুরু করে। পরে মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ কোকোকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করতেন।

শুরুর দিকে চকলেট মোটেও আজকের মতো মিষ্টি ছিল না। মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ কোকো বীজ ভেজে গুঁড়ো করে তার সঙ্গে পানি, মরিচ, ভুট্টার গুঁড়ো এবং বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে একটি তেতো পানীয় তৈরি করত। এটি ছিল ধর্মীয় আচার, রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং বিশেষ অতিথিদের আপ্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা কোকো ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার পর এর স্বাদ বদলাতে শুরু করে। ইউরোপীয়রা তেতো পানীয়টি নিজেদের পছন্দমতো তৈরি করতে এতে চিনি, দারুচিনি, ভ্যানিলা এবং পরে দুধ মেশাতে শুরু করেন। এতে চকলেটের তেতো স্বাদ অনেকটাই কমে যায় এবং এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় মিষ্টি পানীয়ে পরিণত হয়।

এরপর উনবিংশ শতকে কোকো প্রেস আবিষ্কার এবং আধুনিক চকলেট তৈরির প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার ফলে কঠিন বা বার আকারের চকলেট তৈরি সম্ভব হয়। পরে দুধ চকলেট, ডার্ক চকলেট এবং বিভিন্ন স্বাদের চকলেট বাজারে আসতে শুরু করে। এভাবেই একসময়কার তেতো কোকোর পানীয় আজকের সবার প্রিয় মিষ্টি চকলেটে রূপ নেয়।

একসময় কোকো বীজ ছিল মুদ্রা। অ্যাজটেক সভ্যতায় কোকো বীজ এতটাই মূল্যবান ছিল যে অনেক সময় এটি টাকা হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ইতিহাসে উল্লেখ আছে, কয়েকটি কোকো বীজ দিয়ে খাবার কেনা যেত, আবার শত শত বীজ দিয়ে পোশাক বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিসও কেনা সম্ভব ছিল।

ইউরোপে কীভাবে পৌঁছায় চকলেট?

ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা আমেরিকা থেকে কোকো ইউরোপে নিয়ে যায়। প্রথমদিকে চকলেট ছিল শুধুমাত্র ধনী ও রাজপরিবারের মানুষের জন্য বিলাসবহুল পানীয়।

পরে এতে চিনি, দুধ এবং ভ্যানিলা যোগ করা শুরু হয়। ধীরে ধীরে চকলেটের স্বাদ আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকার অলমেক সভ্যতার মানুষ প্রথম কোকো ব্যবহার শুরু করে।  ছবি : সংগৃহীত
প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকার অলমেক সভ্যতার মানুষ প্রথম কোকো ব্যবহার শুরু করে। ছবি : সংগৃহীত

উনবিংশ শতকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে শক্ত বা বার আকারের চকলেট তৈরি সম্ভব হয়। এরপর থেকেই চকলেট সাধারণ মানুষের কাছেও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

চকলেট কীভাবে তৈরি হয়?

চকলেট তৈরির যাত্রা শুরু হয় কোকো ফল সংগ্রহের মাধ্যমে। এরপর কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়।

প্রথমেই কোকো ফল থেকে বীজ বের করে নেয়া হয়। এরপর এইবীজ কয়েক দিন ফারমেন্ট করা হয়। এবার রোদে শুকানোর পালা। এই শুকনো বীজ ভেজে খোসা ছাড়ানো হয়। পরে তা পিষে কোকো মাস তৈরি করা হয়।

শেষে কোকো বাটার, চিনি, দুধের গুঁড়োসহ অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে বিভিন্ন ধরনের চকলেট তৈরি করা হয়।

চকলেটের প্রধান ধরন

ডার্ক চকলেট: এতে কোকোর পরিমাণ বেশি এবং চিনি তুলনামূলক কম থাকে। অনেকেই স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে এটি বেছে নেন।

মিল্ক চকলেট: এটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এতে কোকোর পাশাপাশি দুধ এবং চিনি থাকে, ফলে স্বাদ হয় মিষ্টি ও নরম।

হোয়াইট চকলেট: এতে কোকো সলিড থাকে না। এটি মূলত কোকো বাটার, দুধ এবং চিনি দিয়ে তৈরি হয়।

চকলেট খাওয়ার কিছু উপকারিতা

পরিমিত পরিমাণে, বিশেষ করে বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকলেট খেলে কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যেতে পারে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

এটি হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণা বলে, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে মন ভালো রাখতে এবং মানসিক চাপ কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে অতিরিক্ত চকলেট খেলে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরি শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সবসময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।

চকলেট নিয়ে কিছু মজার তথ্য

কোকো গাছের ফল ধরতে সময় লাগে: একটি কোকো গাছ সাধারণত ফল দিতে শুরু করতে প্রায় ৩ থেকে ৫ বছর সময় নেয়।

একটি কোকো ফলে অনেক বীজ থাকে: একটি কোকো ফলে সাধারণত ২০ থেকে ৬০টি পর্যন্ত বীজ থাকতে পারে।

সাদা চকলেট আসলে পুরোপুরি চকলেট নয়: হোয়াইট চকলেটে কোকো সলিড থাকে না। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে প্রচলিত অর্থে পূর্ণাঙ্গ চকলেট হিসেবে বিবেচনা করেন না।

সবচেয়ে বেশি কোকো উৎপাদন হয় আফ্রিকায়: বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কোকো উৎপাদিত হয় পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে। এর মধ্যে আইভরি কোস্ট এবং ঘানা সবচেয়ে বড় উৎপাদক।

কয়েকটি কোকো বীজ দিয়ে খাবার কেনা যেত, আবার শত শত বীজ দিয়ে পোশাক বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিসও কেনা সম্ভব ছিল। ছবি : সংগৃহীত
কয়েকটি কোকো বীজ দিয়ে খাবার কেনা যেত, আবার শত শত বীজ দিয়ে পোশাক বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিসও কেনা সম্ভব ছিল। ছবি : সংগৃহীত

চকলেট কুকুর ও বিড়ালের জন্য বিপজ্জনক: চকলেটে থাকা থিওব্রোমিন নামের একটি উপাদান কুকুর ও বিড়ালের শরীর সহজে ভাঙতে পারে না। তাই তাদের চকলেট খাওয়ানো উচিত নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ছিল চকলেট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক দেশের সেনাদের রেশন প্যাকেটে চকলেট রাখা হতো। এটি দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করত এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যেত।

সবচেয়ে দামি চকলেটের দাম অবাক করার মতো: বিশ্বের কিছু বিলাসবহুল চকলেট হাতে তৈরি হয় এবং এতে ব্যবহৃত হয় বিরল কোকো, বিশেষ উপাদান কিংবা সোনার পাত। এসব চকলেটের দাম সাধারণ চকলেটের তুলনায় বহু গুণ বেশি।


বিশ্ব চকলেট দিবস কেন পালন করা হয়?

প্রতি বছর ৭ জুলাই বিশ্ব চকলেট দিবস পালন করা হয়। অনেকের মতে, এই দিনে ইউরোপে প্রথম চকলেটের প্রচলন শুরু হয়েছিল। যদিও এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে, তবুও দিনটি বিশ্বজুড়ে চকলেটপ্রেমীদের জন্য একটি আনন্দের উপলক্ষ হিসেবে পালিত হয়।

চকলেট কিনতে কী বিষয় খেয়াল রাখবেন?

চকলেট কেনার সময় কয়েকটি বিষয় দেখে নেওয়া ভালো।

উপাদানের তালিকা পড়ে নিন এবং কোকোর পরিমাণ বেশি থাকলে সাধারণত ডার্ক চকলেট বেশি পুষ্টিগুণসম্পন্ন হয়। অতিরিক্ত চিনি বা কৃত্রিম উপাদান আছে কি না দেখে নেয়ার পাশাপাশি মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ অবশ্যই পরীক্ষা করুন।

মনে রাখবেন, গরমে চকলেট দ্রুত গলে যেতে পারে, তাই ঠান্ডা ও শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করুন।

চকলেট শুধু একটি সুস্বাদু খাবার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগ। একসময় যা ছিল রাজাদের পানীয়, আজ তা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারগুলোর একটি। তবে যতই প্রিয় হোক, চকলেট খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমিতি বজায় রাখাই সবচেয়ে ভালো অভ্যাস।