তামার পাত্রে রাখা পানি পান করলে শরীরে কী ঘটে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
তামার পাত্রে রাখা পানি পান করলে শরীরে কী ঘটে
ছবি : সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন অনেক মানুষের মধ্যে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেটি হলো তামার গ্লাস বা পাত্রে পানি রেখে পান করা। অনেকেই রাতে তামার পাত্রে পানি রেখে সকালে খালি পেটে তা পান করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, এই অভ্যাস হজমশক্তি উন্নত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, প্রদাহ কমায় এবং বার্ধক্যের প্রভাব ধীর করতে সাহায্য করে।

Advertisement

তবে এই ধারণা একেবারে নতুন নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে, তামার পাত্রে পানি সংরক্ষণের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কি এসব দাবিকে সমর্থন করে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে বাস্তবতা থাকলেও প্রচলিত অনেক দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তামার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বা জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে

তামা একটি প্রয়োজনীয় খনিজ, যা শরীরে শক্তি উৎপাদন, আয়রনের ব্যবহার, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সংযোজক টিস্যু গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শুধু এই কারণেই তামার পাত্রে রাখা পানি পান করলে স্বাস্থ্য ভালো হবে, এমনটি বলা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের হোলি নেম মেডিকেল সেন্টারের নিউট্রিশন আউটরিচ ম্যানেজার পুষ্টিবিদ ডেবি বেসেন বলেন, তামার গ্লাসের সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত উপকারিতা হলো পানিবাহিত কিছু ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা। এটি ই.কোলাই, কলেরা, শিগেলা এবং সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে এবং প্রাকৃতিক পানি পরিশোধকের মতো কাজ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক ঘণ্টা তামার পাত্রে পানি সংরক্ষণ করলে পানিতে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে যেতে পারে। এ কারণেই অতীতে যেসব এলাকায় নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা ছিল না, সেখানে তামার পাত্র ব্যবহারের প্রচলন দেখা যেত।

তবে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ডেবি বেসেনের ভাষায়, যদি পানির যথাযথ পরিশোধন করা হয়ে থাকে, তাহলে তামার পাত্র ব্যবহার করে বাড়তি কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায় না।

অন্যান্য স্বাস্থ্য দাবির কী ভিত্তি আছে?

অনলাইনে প্রচারিত অনেক দাবির মধ্যে রয়েছে হজমশক্তি বৃদ্ধি, প্রদাহ কমানো, থাইরয়েডের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত মানবভিত্তিক গবেষণা পাওয়া যায়নি।

একই হাসপাতালের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ সিডনি ল্যাপে জানান, যে তামা শরীরের জন্য অপরিহার্য হলেও অধিকাংশ মানুষ খাদ্য থেকেই প্রয়োজনীয় তামা পেয়ে যান। ঝিনুক, কলিজা, বিভিন্ন বাদাম, বীজ এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারে পর্যাপ্ত তামা থাকে। তাই তামার গ্লাসে রাখা পানি পান করলে অতিরিক্ত কোনো উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যায়, এমন প্রমাণ এখনো নেই।

তবে একটি পরোক্ষ সুবিধা থাকতে পারে।

প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্রের তুলনায় তামার গ্লাসে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিক-সম্পর্কিত রাসায়নিকের ঝুঁকি থাকে না। যদিও মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে, অনেকেই এ কারণে তামা, কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

কখন তামার গ্লাস ব্যবহার করবেন না

সাধারণত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য মাঝে মাঝে তামার গ্লাসে রাখা পানি পান করা ক্ষতিকর নয়। তবে বেশি ব্যবহার মানেই বেশি উপকার নয়। পানি দীর্ঘ সময় তামার পাত্রে থাকলে অল্প পরিমাণ তামা পানিতে মিশতে পারে। নিয়মিত অতিরিক্ত মাত্রায় তামা গ্রহণ করলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সিডনি ল্যাপে বলেন, শরীরে অতিরিক্ত তামা প্রবেশ করলে বমি বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি, বমি এবং ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

লেবু পানি বা টক পানীয় তামার গ্লাসে রাখা উচিত নয়

বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক করেছেন। সাধারণ পানি থেকে তুলনামূলকভাবে কম তামা পানিতে মিশলেও টক জাতীয় পানীয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।

ডেবি বেসেন জানান, লেবু, লেবুজাতীয় ফল বা কিছু ফলের রস তামার সঙ্গে বিক্রিয়া করে পানিতে অনেক বেশি তামা মিশিয়ে দিতে পারে। এতে পানীয়তে তামার মাত্রা অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

তাই তামার গ্লাসে লেবু পানি, কমলার রস বা অন্য কোনো অম্লীয় পানীয় রাখা উচিত নয়।

কিছু মানুষের জন্য বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন

যাদের শরীরে তামা বিপাকজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য তামার পাত্র ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে উইলসন ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীর অতিরিক্ত তামা সঠিকভাবে বের করতে পারে না। ফলে তাদের ক্ষেত্রে তামা জমে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তামার পাত্রে পানি রাখার অভ্যাসের কিছু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, বিশেষ করে এর জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্যের কারণে। তবে এটি কোনো অলৌকিক স্বাস্থ্য সমাধান নয়। হজমশক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো বা বার্ধক্য ধীর করার মতো জনপ্রিয় দাবিগুলোর পক্ষে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তাই তামার গ্লাসে পানি পান করতে চাইলে তা পরিমিতভাবে করা উচিত। একই সঙ্গে টক পানীয় এ ধরনের পাত্রে না রাখা এবং কোনো বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: ভেরি ওয়েল হেল্থ