মেথি কতটা স্বাস্থ্যকর

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মেথি কতটা স্বাস্থ্যকর
ছবি : সংগৃহীত

রান্নাঘরের পরিচিত মসলা মেথি শুধু খাবারের স্বাদ ও গন্ধই বাড়ায় না, বহু সংস্কৃতিতে এটি ভেষজ উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে মেথি নিয়ে যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতার কথা প্রচলিত রয়েছে, তার সবকটির পেছনে এখনও শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও এর পুষ্টিগুণ এবং বহুমুখী ব্যবহার মেথিকে বিশেষ করে তুলেছে।

Advertisement

মেথি মূলত একটি সুপরিচিত উদ্ভিদ, যা মধ্যপ্রাচ্য, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হয়। এটি একদিকে যেমন মসলা, তেমনি শাক ও ভেষজ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

প্রাকৃতিক চিকিৎসাবিদ ডা. জ্যাকব হিল জানান, মেথির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে খাদ্য ও চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রেই। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এটি বিশেষভাবে পরিচিত হলেও ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা এবং পাশ্চাত্য ভেষজ চিকিৎসাতেও মেথির ব্যবহার দেখা যায়।

মেথির পুষ্টিগুণ

সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে মেথি বেশ উপকারী হতে পারে। এর বীজ ও পাতা উভয়ই পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। ডা. হিলের মতে, মেথির বীজে রয়েছে প্রচুর আঁশ ও প্রোটিন। এছাড়া এটি আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। অন্যদিকে মেথি শাকে ক্যালোরি কম থাকলেও এতে ভিটামিন এ ও ভিটামিন সি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাওয়া যায়।

মেথির স্বাদ কেমন?

মেথির স্বাদ ও গন্ধকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর গন্ধ অনেকটা ম্যাপল সিরাপের মতো মিষ্টি মনে হতে পারে। আবার কখনও এটি হালকা তেতো, মাটির ঘ্রাণযুক্ত, বাদামি স্বাদ কিংবা ভেষজ ধরনের স্বাদও দিতে পারে। মূলত এর স্বাদ নির্ভর করে কতটুকু ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে তার ওপর।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মেথি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

ডা. হিল বলেন, মেথির সম্ভাব্য চিকিৎসাগত উপকারিতার মধ্যে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে পাওয়া প্রমাণ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের। তাই ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প হিসেবে মেথিকে বিবেচনা করা উচিত নয়।

বুকের দুধ উৎপাদন বাড়াতে পারে

অনেকের ধারণা, মেথি বুকের দুধের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। কিছু ছোট গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। এ পর্যন্ত পাওয়া অধিকাংশ তথ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল, শক্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর নয়।

তাই গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদানকালীন সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মেথির সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করাই ভালো।

মেথি নিয়ে আরও যেসব দাবি প্রচলিত

মেথিকে ঘিরে আরও কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতার কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে সেগুলোর পক্ষে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

এর মধ্যে রয়েছে

  • পুরুষদের টেস্টোস্টেরন বৃদ্ধি করা
  • যৌন সক্ষমতা উন্নত করা
  • প্রদাহ কমানো
  • কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করা
  • হজমশক্তি উন্নত করা
  • বুকজ্বালা কমানো
  • ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা

ডা. হিলের ভাষায়, প্রমাণের অভাব মানেই যে মেথি কাজ করে না, তা নয়। বরং এর অর্থ হলো বিষয়টি এখনও যথেষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি।

কারা মেথির সাপ্লিমেন্ট এড়িয়ে চলবেন?

নিচের অবস্থাগুলোর কোনোটি থাকলে মেথির সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

  • গর্ভবতী হলে
  • ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করলে
  • রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করলে
  • অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চললে
  • হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসার থাকলে

তবে রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে ব্যবহৃত মেথি সাধারণত অধিকাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে মনে করা হয়।

মেথি সাপ্লিমেন্টের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

খাবারে ব্যবহৃত মেথি ও সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত মেথির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ডা. হিল জানান, খাবারে ব্যবহৃত মেথিতে সক্রিয় উপাদানগুলোর মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু সাপ্লিমেন্টে এই উপাদানগুলোর ঘনত্ব অনেক বেশি হতে পারে।

ফলে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমন-

  • ডায়রিয়া
  • পেটব্যথা ও গ্যাস
  • বদহজম
  • রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বৃদ্ধি
  • রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়া
  • ক্ষুধামন্দা
  • শরীর থেকে অস্বাভাবিক মিষ্টি ধরনের গন্ধ বের হওয়া
  • অ্যালার্জি বা হাঁপানির প্রতিক্রিয়া

এছাড়া অতিরিক্ত মেথি গ্রহণের সঙ্গে বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত, যকৃতের সমস্যা বা স্নায়বিক জটিলতার সম্পর্ক নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে শক্ত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। যাদের ওরাল অ্যালার্জি সিনড্রোম রয়েছে, তাদের জন্য মেথি সমস্যা তৈরি করতে পারে।

কারণ মেথির সঙ্গে চিনাবাদাম ও ছোলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এদের কিছু প্রোটিনের গঠন পরাগরেণুর প্রোটিনের সঙ্গে মিল থাকায় শরীর একই ধরনের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

মেথি একটি পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু ভেষজ উদ্ভিদ, যা বহু শতাব্দী ধরে খাদ্য ও চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান। তাই মেথি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি কেউ নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন বা কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগে থাকেন।

ডা. হিলের মতে, রোগী কী ধরনের ভেষজ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন তা চিকিৎসকের জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো অন্যান্য ওষুধের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সুতরাং মেথি উপকারী হতে পারে, তবে সচেতনতা এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই এর ব্যবহার করা উচিত।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক