মেসির রেকর্ডের রাতে আলো কেড়ে নিলেন ১০০ বছরের ভক্ত

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
মেসির রেকর্ডের রাতে আলো কেড়ে নিলেন ১০০ বছরের ভক্ত
ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন লিওনেল মেসি। জোড়া গোল করেছেন, বিশ্বকাপের গোলরেকর্ডে নতুন উচ্চতায় উঠেছেন, আর্জেন্টিনাকে শেষ ৩২-এ তুলেছেন। কিন্তু ডালাসের সেই রাতের আরেকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা করে জায়গা করে নেয়। গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা এক প্রবীণ নারী, হাতে মেসিকে ভালোবাসার বার্তা লেখা প্ল্যাকার্ড।

Advertisement

তার নাম পলিন কানা। অনেকে তাকে চেনেন ‘গ্যাংস্টার গ্র্যানি’ নামে। বয়স ১০০ ছুঁইছুঁই, কিন্তু ফুটবল নিয়ে তার উচ্ছ্বাসে বয়সের কোনো ছাপ নেই। অস্ট্রিয়া-আর্জেন্টিনা ম্যাচে গ্যালারিতে বসে মেসির খেলা দেখছিলেন তিনি। সম্প্রচার ক্যামেরা যখন তাকে দেখায়, মুহূর্তেই তিনি হয়ে ওঠেন ম্যাচের বাইরের বড় গল্প।

পলিনের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে নিজেকে ১০০ বছরের মেসিভক্ত হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা যায়। ফুটবল মাঠে এমন দৃশ্য নতুন নয়। ভক্তরা প্রিয় খেলোয়াড়ের জন্য প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসেন, জার্সি পরেন, গান করেন। কিন্তু পলিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ তিনি শুধু একজন ভক্ত নন, তিনি যেন প্রমাণ করে দিচ্ছেন প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা বয়স মানে না।

মেসিকে ঘিরে তার আগ্রহ নতুন নয়। এর আগেও ইন্টার মায়ামির ম্যাচে তাকে মেসির জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা গেছে। একটি প্ল্যাকার্ডে তিনি মেসিকে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। বার্তাটি ছিল মজার, কিন্তু তার মধ্যে ছিল সরল ভক্তির প্রকাশ।

মেসিও তাকে লক্ষ্য করেছিলেন। ওয়ার্ম-আপের সময় দূর থেকে পলিনের দিকে তাকিয়ে হাসেন এবং হাত নাড়েন বলে আগের ভিডিওগুলোতে দেখা যায়। কোনো দীর্ঘ কথোপকথন হয়নি, কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎও নয়। তবু এক কিংবদন্তি ফুটবলার ও তার প্রবীণ ভক্তের মধ্যে সেই ছোট্ট মুহূর্তই ভাইরাল হয়ে যায়।

পলিন কানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিচিত মুখ। নাতি রস স্মিথের সঙ্গে মজার ভিডিও বানিয়ে তিনি জনপ্রিয়তা পান। তাদের ভিডিওতে প্রায়ই দেখা যায়, বয়সকে বাধা না মেনে নতুন কিছু করতে চান পলিন। এই স্বতঃস্ফূর্ততা তাকে অনলাইনে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

সম্প্রতি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ক্রাউড সার্ফার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ৯৯ বছর ২৭৪ দিন বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি কনসার্টে দর্শকদের হাতের ওপর ভেসে ক্রাউড সার্ফ করে রেকর্ড গড়েন তিনি। এই ঘটনাও দেখিয়েছে, পলিন জীবনকে শুধু বয়সের হিসাবে মাপেন না। তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়ার আনন্দ এখনও জীবন্ত।

ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তার উপস্থিতি, তাই শুধুই মজার ঘটনা নয়। এটি মেসির প্রভাবেরও একটি বড় উদাহরণ। মেসির ভক্ত শুধু আর্জেন্টিনায় বা তরুণ প্রজন্মে সীমাবদ্ধ নয়। শিশু থেকে প্রবীণ, লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়া, ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র—সব জায়গায় মেসি এমন এক আবেগ তৈরি করেছেন, যা বয়স ও ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

পলিন কানা সেই আবেগেরই এক মানবিক মুখ। তিনি পেশাদার বিশ্লেষক নন, ফুটবল ইতিহাসের গবেষকও নন। তিনি একজন সাধারণ ভক্ত, যিনি মেসিকে দেখতে মাঠে যান, তার জন্য প্ল্যাকার্ড ধরেন এবং আনন্দ করেন। ফুটবলকে বড় করে তোলে এমন মানুষই—যারা খেলার সঙ্গে নিজেদের আবেগ জড়িয়ে ফেলেন।

মেসির অস্ট্রিয়া ম্যাচও ছিল ইতিহাসের রাত। তিনি জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে জেতান। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা নতুন রেকর্ডে পৌঁছায়। কিন্তু গ্যালারির পলিন কানা মনে করিয়ে দেন, রেকর্ডের বাইরে ফুটবলের আরেকটি জীবন আছে। সেটি ভক্তদের গল্প।

একজন খেলোয়াড়কে কিংবদন্তি করে তোলে শুধু ট্রফি বা গোল নয়, মানুষের স্মৃতিতে তার জায়গাও। পলিন কানার মতো একজন প্রবীণ ভক্ত যখন মেসির জন্য গ্যালারিতে প্ল্যাকার্ড হাতে বসেন, তখন বোঝা যায় মেসির প্রভাব পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে।

এই গল্পে হাসি আছে, আবেগ আছে, আবার একটি বড় বার্তাও আছে। বয়স বাড়লেই আনন্দ কমে যেতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। প্রিয় খেলোয়াড়কে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার অধিকার ১০ বছরের শিশুর যেমন আছে, ১০০ ছুঁইছুঁই একজন মানুষেরও আছে। পলিন কানা সেটিই দেখিয়েছেন।

তার মেসিকে বিয়ের প্রস্তাব হয়তো মজার, কিন্তু এর ভেতরে আছে ভক্তির নির্মলতা। তিনি কোনো বিতর্ক তৈরি করতে আসেননি। এসেছিলেন নিজের প্রিয় খেলোয়াড়কে দেখতে। আর সেই ভালোবাসাই তাকে বিশ্বকাপের এক ঐতিহাসিক রাতে আলাদা করে আলোয় নিয়ে এসেছে।

মেসি হয়তো মাঠে ইতিহাস লিখছেন। আর গ্যালারিতে পলিন কানা দেখাচ্ছেন, সেই ইতিহাস কীভাবে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। তিনি তাই শুধু মেসির ভক্ত নন; তিনি ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর সত্যগুলোর একটি মনে করিয়ে দেন—ভালোবাসার কোনো বয়স নেই।