গোল্ডেন বুটের আগুনে লড়াই, এগিয়ে কারা

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
গোল্ডেন বুটের আগুনে লড়াই, এগিয়ে কারা
বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট। ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড় এখন রূপ নিয়েছে প্রজন্মসেরা তারকাদের লড়াইয়ে। সামনে লিওনেল মেসি, ঠিক পেছনে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হলান্ড। দুই ম্যাচ শেষে মেসির গোল ৫টি, এমবাপ্পে ও হলান্ডের ৪টি করে। তিনজন মিলেই করেছেন ১৩ গোল। অল্প পিছনে আছেন আরো অনেক তারকা। বিশ্বকাপের শুরুতেই এমন গোলঝড় ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

Advertisement

বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুই ম্যাচ শেষে তিনজন খেলোয়াড়ের চার বা তার বেশি গোল করার ঘটনা খুবই বিরল। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই বিরল দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে। মেসি, এমবাপ্পে, হলান্ড—তিনজনই নিজেদের দলকে জেতাচ্ছেন, রেকর্ড গড়ছেন, আবার একে অন্যকেও চাপ দিচ্ছেন।

বিশ্বকাপের এক দিন ছিল যেন তারকাদের দিন। আগে মেসি অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে জেতান। সেই গোলেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। পরে ঝড়-বৃষ্টিতে বিলম্বিত ম্যাচে ইরাকের বিপক্ষে ফ্রান্সকে ৩-০ গোলে জেতাতে জোড়া গোল করেন এমবাপ্পে। এরপর হলান্ডও পিছিয়ে থাকেননি। নরওয়ের হয়ে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে শেষ ৩২-এ তুলেছেন তিনি।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে পুরুষদের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসে, ১৬ গোল নিয়ে। দুই ম্যাচ পর ছবিটা বদলে গেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের পর মেসি এখন ২৮ ম্যাচে ১৮ গোল নিয়ে শীর্ষে। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সব ৫ গোলই করেছেন তিনি।

কিন্তু মেসির রেকর্ড নিরাপদ নয়। এমবাপ্পে এখন ১৬ বিশ্বকাপ গোল নিয়ে ক্লোসের পাশে। সেটিও মাত্র ১৬ ম্যাচে। তার বয়স ২৭। ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি শুধু সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়েই মেসির কাছে পৌঁছাননি, বিশ্বকাপের সামগ্রিক গোলরেকর্ডেও মেসির ওপর চাপ তৈরি করেছেন।

ফরাসি তারকা অবশ্য নিজের মুখে বলছেন, তিনি মেসির দিকে তাকিয়ে খেলছেন না। তার বক্তব্য, মেসি সব সময় গোল করেন, তাই তাকে দেখলে আরও বেশি করার চাপ তৈরি হবে। বরং তিনি নিজের দলকে সাহায্য করার কথাই ভাবছেন। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, এমবাপ্পে এখন মেসির রেকর্ডের সবচেয়ে বড় অনুসরণকারী।

হলান্ডের গল্প আবার আলাদা। এটি তার প্রথম বিশ্বকাপ, কিন্তু শুরুটাই করেছেন ভয়ংকরভাবে। দুই ম্যাচে দুটি করে গোল, মোট ৪ গোল। নরওয়ের হয়ে তার আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যাও অবিশ্বাস্য—৫২ ম্যাচে ৫৯ গোল। বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন হলেও গোল করার প্রবৃত্তিতে তিনি পুরোনো ভয়ই দেখাচ্ছেন।

নরওয়ে কোচ স্তালে সলবাকেন স্বাভাবিকভাবেই হলান্ডকে সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে বড় দাবিদার হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনার মতো দলের হয়ে এই পুরস্কার জেতা তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু হলান্ড নরওয়ের হয়ে চার গোল করেছেন। সলবাকেনের ভাষায়, হলান্ড আগুনে ছন্দে আছেন এবং নরওয়ে তাকে আরও ম্যাচ, আরও সহায়তা দিতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের চোখেও এই লড়াই অনন্য। মেসি অসাধারণ ফুটবল-বুদ্ধি ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক, এমবাপ্পে গতি ও বড় মঞ্চে কার্যকারিতার নাম, আর হলান্ড বক্সের ভেতরে নির্মম গোলশিকারি। তিনজনের খেলার ধরন আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য একই গোল।

ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন, জার্মানির ডেনিজ উনদাভ, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুসও এই দৌড় থেকে বাইরে নন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন তিনি। আগেও বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতা কেইনকে তাই পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। তবে এই মুহূর্তে আলো সবচেয়ে বেশি মেসি, এমবাপ্পে ও হলান্ডের ওপরই।

এই বিশ্বকাপে গোলের সম্ভাবনা বাড়ার পেছনে ফরম্যাটও ভূমিকা রাখছে। ৪৮ দলের টুর্নামেন্টে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের সংখ্যা বেড়েছে। বড় দলগুলোর আক্রমণভাগ তাই বেশি সুযোগ পাচ্ছে। আবার চ্যাম্পিয়ন হতে হলে আগের চেয়ে এক রাউন্ড বেশি খেলতে হবে। অর্থাৎ তারকারা টুর্নামেন্টে যতদূর যাবেন, গোল বাড়ানোর সুযোগও তত বেশি পাবেন।

এ কারণেই আলোচনায় এসেছে এক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও। ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন ১৯৫৮ বিশ্বকাপে করেছিলেন ১৩ গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে দুই অঙ্কের গোল করেছেন মাত্র কয়েকজন। ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরু দেখে মনে হচ্ছে, সেই বিরল তালিকায় নতুন নাম যোগ হওয়া অসম্ভব নয়।

মেসি এখন ৫ গোলে। সামনে গ্রুপের শেষ ম্যাচ এবং নকআউট। আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। তবে শেষ গ্রুপ ম্যাচে লিওনেল স্কালোনি কিছু খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিলে মেসির মাঠে থাকার সময় কতটা হবে, সেটিও দেখার বিষয়। আবার মেসি নিজেও ৩৯-এর কাছাকাছি বয়সে চাপ সামলানোর পরিকল্পনায় থাকতে পারেন।

এমবাপ্পের সামনে সুযোগ আরও বড়। ফ্রান্স আক্রমণে শক্তিশালী, সুযোগ তৈরি করে নিয়মিত, এবং এমবাপ্পে টুর্নামেন্টের বড় ম্যাচে গোল করতে অভ্যস্ত। ২০১৮, ২০২২, ২০২৬—তিন বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার ধারাবাহিকতা অবিশ্বাস্য। মেসির ১৮ গোলের রেকর্ড তাড়া করার বাস্তব সম্ভাবনা এখন তার সামনেই।

হলান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নরওয়ে কতদূর যাবে। ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনার মতো গভীর দল তার নেই। কিন্তু তার গোল করার ক্ষমতা এমন যে অল্প সুযোগেও ম্যাচ বদলে দিতে পারেন। নরওয়ে যদি আরও কয়েক ম্যাচ পায়, সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে হলান্ডকে থামানো কঠিন হতে পারে।

এই লড়াইয়ের বাইরে আরও নাম আছে। জার্মানির ডেনিজ উন্দাভ, কানাডার জনাথন ডেভিড, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন, যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগানদের মতো খেলোয়াড়ও তালিকায় আছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে দৌড়ের আগুন সবচেয়ে বেশি জ্বলছে তিনজনকে ঘিরে: মেসি, এমবাপ্পে, হলান্ড।

সেটিই হয়তো এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ের সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা। মেসি অনিবার্য। এমবাপ্পে অনিবার্য। হলান্ডও অনিবার্য হতে চাইছেন। আর তাদের এই পারস্পরিক চাপই ২০২৬ বিশ্বকাপকে গোলের এক বিশেষ অধ্যায়ে পরিণত করছে।

সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ের বর্তমান চিত্র

১. লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনা—৫ গোল

২. কিলিয়ান এমবাপ্পে, ফ্রান্স—৪ গোল

২. আর্লিং হলান্ড, নরওয়ে—৪ গোল

৪. ডেনিজ উন্দাভ, জার্মানি—৩ গোল

৪. জনাথন ডেভিড, কানাডা—৩ গোল

এরপর ২ গোলের দলে আছেন হ্যারি কেইন, ম্যাতেউস কুনহা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ফোলারিন বালোগানসহ আরও কয়েকজন।