মেসির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন এমবাপ্পে-হলান্ড

বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড় এখন তারকাদের লড়াই। লিওনেল মেসি সামনে, কিন্তু খুব বেশি দূরে নন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হলান্ড। দুই ম্যাচে ৫ গোল করে মেসি আপাতত শীর্ষে। তবে এমবাপ্পে ও হলান্ড দুজনই ৪ গোল নিয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন।
৩৯-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু করেছেন অবিশ্বাস্য ছন্দে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল। আর্জেন্টিনার ৫ গোলই এসেছে তার পা থেকে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই জোড়া গোলেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের গোলরেকর্ড নতুন করে লিখেছেন। বিশ্বকাপে তার গোল এখন ১৮।
মেসির রেকর্ডের দুটি দিক আছে। প্রথম গোল করে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। দ্বিতীয় গোল করে ছাড়িয়ে যান ব্রাজিলের নারী ফুটবল কিংবদন্তি মার্তাকেও। ফলে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল এখন মেসির।
তবে চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে মেসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দুই প্রজন্মের দুই ভয়ংকর গোলশিকারি। ফ্রান্সের এমবাপ্পে ও নরওয়ের হলান্ড দুজনই টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই গোলের ভাষায় কথা বলছেন।
ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে চলতি বিশ্বকাপে ৪ গোলে পৌঁছেছেন এমবাপ্পে। সেনেগালের বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। দুই ম্যাচে ৪ গোল, আর বিশ্বকাপে মোট ১৬ গোল—এমবাপ্পে এখন শুধু এই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার নয়, বিশ্বকাপের সামগ্রিক গোলরেকর্ডেও মেসির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
এমবাপ্পে ১৬ বিশ্বকাপ গোল করে ক্লোসের পাশে উঠে গেছেন। ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ছাড়িয়ে ১৮ গোলে পৌঁছেছেন মেসি। এখন এমবাপ্পে মেসির চেয়ে মাত্র ২ গোল পেছনে। বয়স ২৭, সামনে আরও বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা আছে। তবে তার বর্তমান ছন্দ দেখে মনে হচ্ছে, রেকর্ডের লড়াইটা এই বিশ্বকাপেই নতুন মাত্রা পেতে পারে।
ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশমও এমবাপ্পের রেকর্ড সম্ভাবনা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। ইরাক ম্যাচের পর তিনি বলেছেন, এমবাপ্পে একদিন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভাঙতে পারেন। দেশমের চোখে, এমবাপ্পে এমন একজন খেলোয়াড়, যে নিয়মিত গোল করার পথ খুঁজে নেয়।
অন্যদিকে হলান্ডের গল্প আলাদা। নরওয়ে দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে ফিরেছে, আর প্রথম বিশ্বকাপেই নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করেছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। দুই ম্যাচে তার গোল ৪টি। বিশ্বকাপ মঞ্চে নতুন হলেও গোল করার অভ্যাসে তিনি নতুন নন। ক্লাব ফুটবলের সেই ধারালো ফিনিশিং এখন জাতীয় দলের জার্সিতেও দেখা যাচ্ছে।
মেসি ও এমবাপ্পের মতো হলান্ডের সামনে এখনই সর্বকালের বিশ্বকাপ রেকর্ডের হিসাব নেই। কারণ এটি তার প্রথম বিশ্বকাপ। কিন্তু চলতি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে তিনি সমান বিপজ্জনক। নরওয়ের আক্রমণ তার ওপর নির্ভরশীল, আর বক্সের ভেতরে সুযোগ পেলে হলান্ডের মতো নির্দয় স্ট্রাইকার খুব কমই আছে।
এবারের দৌড়কে আরও আকর্ষণীয় করছে তিনজনের তিন রকম গল্প। মেসি শেষ বয়সে ইতিহাস বাড়াচ্ছেন। এমবাপ্পে মেসির রেকর্ডের দিকে ছুটছেন। হলান্ড নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই বিশ্বমঞ্চ দখল করতে চাইছেন।
শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে তিন দলই। ফলে সামনে আরও ম্যাচ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। গোল বাড়ানোর সুযোগও থাকবে সবারই।
এমবাপ্পের অবস্থান শক্ত। ফ্রান্স শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে এবং আক্রমণে তাদের বিকল্প অনেক। ওসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা, রায়ান শেরকি—সবাই মিলে এমবাপ্পের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফ্রান্স যতদূর যাবে, এমবাপ্পের গোলসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাও তত বেশি।
হলান্ডের ক্ষেত্রে বড় পরীক্ষা আসছে সামনে। নরওয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করলেও গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াই বাকি। শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে নামবে তারা। সেই ম্যাচেই বোঝা যাবে, বড় দলের বিপক্ষে নরওয়ের আক্রমণ কতটা ধার ধরে রাখতে পারে। তবে হলান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি ম্যাচে অনেক সময় অদৃশ্য থেকেও এক মুহূর্তে গোল করতে পারেন। সেটিই তাকে এই দৌড়ে বিপজ্জনক রাখছে।
সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে অন্য নামও আছে। বিশ্বকাপে এক ম্যাচেই হিসাব বদলে যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে আলো সবচেয়ে বেশি তিনজনের ওপর—মেসি, এমবাপ্পে, হলান্ড। একজন ইতিহাসের শিখরে দাঁড়িয়ে, একজন সেই শিখরের দিকে ধেয়ে আসছেন, আরেকজন প্রথম বিশ্বকাপেই নিজের জায়গা দাবি করছেন।





