জর্ডানকে বিদায় করে নকআউটের আশা বাঁচাল আলজেরিয়া

আর্জেন্টিনার কাছে প্রথম ম্যাচে ৩-০ গোলে হারের পর আলজেরিয়ার বিশ্বকাপ অভিযান শুরুতেই বিপদে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু জর্ডানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের আশা বাঁচিয়ে রাখল আফ্রিকার দলটি। ২-১ গোলের জয়ে শেষ ৩২-এ ওঠার লড়াইয়ে টিকে থাকল লুকা জিদানের আলজেরিয়া। আর এই হারে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই বড় ধাক্কা খেল জর্ডান।
সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুটা ছিল জর্ডানের। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেও সাহসী ফুটবল খেলে নজর কাড়ে তারা। আলজেরিয়ার বিপক্ষেও একই মানসিকতা নিয়ে নামে জামাল সেল্লামির দল। রক্ষণে হুসাম আবু দাহাব ও আক্রমণে মাহমুদ আল-মারদিকে এনে দুটি পরিবর্তন করলেও নিজেদের তিন ডিফেন্ডারের কাঠামো বজায় রাখে জর্ডান। দুই উইং-ব্যাক অনেক ওপরে উঠে খেলছিলেন, আর মুসা আল-তামারির নেতৃত্বে পাল্টা আক্রমণে আলজেরিয়াকে বারবার সতর্ক করছিল তারা।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হতাশাজনক হারের পর আলজেরিয়া কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ একাদশে পরিবর্তন আনেন। মাঝমাঠে ইসমায়েল বেনাসেরের জায়গায় শুরু করেন রমিজ জেরুকি। গোলপোস্টে ছিলেন লুকা জিদান। আক্রমণে ছিলেন রিয়াদ মাহরেজ, ফারেস শাইবি, ইব্রাহিম মাজা ও আমিন গুইরি।
ম্যাচ শুরুর ৫০ সেকেন্ডের মধ্যেই জর্ডান বুঝিয়ে দেয়, তারা শুধু রক্ষণে বসে থাকতে আসেনি। লম্বা বল থেকে চাপ তৈরি করে তারা। নিজার আল-রাশদানের হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। আলজেরিয়াও দ্রুত জবাব দেয় পাল্টা আক্রমণে, তবে গুইরির শট পাশের জালে লাগে।
এরপর ধীরে ধীরে বলের নিয়ন্ত্রণ নেয় আলজেরিয়া। বেশির ভাগ সময় বল তাদের পায়েই ছিল। পাসের সংখ্যায়, আক্রমণ গড়ায়, শট নেওয়ায়ও এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু সমস্যা ছিল শেষ তৃতীয়াংশে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যেমন সৃজনশীলতা ও ধার কম দেখা গিয়েছিল, জর্ডানের বিপক্ষেও প্রথমার্ধে সেই সমস্যাই ভুগিয়েছে আলজেরিয়াকে।
মাহরেজ দুটি বড় সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০ মিনিটে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণে বল নামিয়ে গোলের সামনে পৌঁছেও শেষ শটটি ঠিকমতো নিতে পারেননি সাবেক লেস্টার সিটি ও ম্যানচেস্টার সিটি তারকা। আধা ঘণ্টার সময় আবারও সুযোগ আসে তার সামনে, কিন্তু এবারও জর্ডান গোলরক্ষক ইয়াজিদ আবু লাইলা তাঁকে থামিয়ে দেন। সুযোগ নষ্টের মূল্য দিতে হয় আলজেরিয়াকে।
৩৬ মিনিটে মাঝমাঠে আলজেরিয়ার ভুল থেকে বল পায় জর্ডান। দ্রুত আক্রমণে বল যায় আল-তামারির কাছে। তার ক্রস পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না, কিন্তু আল-রাশদান দারুণ শক্তিশালী শটে গোল করেন। লুকা জিদান হাত লাগালেও বল জালে যাওয়া ঠেকাতে পারেননি। বেশি সময় বল রেখেও তখন পিছিয়ে পড়ে আলজেরিয়া।
এই গোল জর্ডানের জন্য ছিল স্বপ্নের মতো, আর আলজেরিয়ার জন্য আতঙ্কের। কারণ এই ফল থাকলে তাদের নকআউটের আশা প্রায় শেষ হয়ে যেত। প্রথমার্ধ শেষে আলজেরিয়া শুধু স্কোরলাইনেই পিছিয়ে ছিল না, মানসিকভাবেও চাপে ছিল।
বিরতিতে তাই বড় সিদ্ধান্ত নেন পেতকোভিচ। জেরুকি ও হিশাম বুদাউইকে তুলে নামান নাবিল বেনতালেব ও নাদির বেনবুয়ালিকে। এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আলজেরিয়ার খেলা সহজ হয়ে যায়নি। জর্ডান নিচে নেমে রক্ষণ সাজালেও পাল্টা আক্রমণে ভয় দেখাচ্ছিল। আল-তামারি বারবার জায়গা খুঁজছিলেন, নুর আল-রাওয়াবদেহর দূরপাল্লার শটও একবার অল্পের জন্য বাইরে যায়।
সময় যত গড়াচ্ছিল, আলজেরিয়ার উদ্বেগ তত বাড়ছিল। বল ছিল তাদের পায়ে, কিন্তু জর্ডানের রক্ষণ ছিল শক্ত। সেই দেয়াল ভাঙতে শেষ পর্যন্ত কাজে লাগে স্থির বলের সুযোগ। মাহরেজের কর্নার থেকে বেনবুয়ালি শক্তিশালী হেডে বল পাঠান জালে। তিন ডিফেন্ডারের মাঝে উঠে দূরের পোস্টের নিচের কোণে বল পাঠিয়ে আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরান বদলি এই ফরোয়ার্ড।
এই গোলের পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়। জর্ডান তখন রক্ষণে আরও সতর্ক হয়ে যায়, আর আলজেরিয়া বুঝে যায় জয় পাওয়া সম্ভব। পেতকোভিচের দল আরও বেশি খেলোয়াড় তুলে আক্রমণে যায়। বদলি খেলোয়াড়দের উপস্থিতি আলজেরিয়ার আক্রমণে নতুন গতি আনে।
৮২ মিনিটে আসে জয়সূচক গোল। আবারও কর্নার, আবারও জর্ডান রক্ষণের অস্থিরতা। বল ঠিকমতো পরিষ্কার করতে না পারায় দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় এগিয়ে যান গুইরি। সবার আগে বলের কাছে পৌঁছে তিনি গোল করেন। স্কোরলাইন হয় ২-১। আলজেরিয়ার ঘুরে দাঁড়ানো পূর্ণতা পায়।
শেষ দিকে জর্ডান চেষ্টা করলেও আর ফিরতে পারেনি। ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যানও আলজেরিয়ার আধিপত্যের কথাই বলে। বলের দখল, পাস ও শটের সংখ্যায় তারা এগিয়ে ছিল। তবে জয়ের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। বরং ধৈর্য, স্থির বলের দক্ষতা এবং বেঞ্চ থেকে পাওয়া প্রভাবই আলজেরিয়াকে বাঁচিয়ে রাখল।
এই জয় আলজেরিয়াকে গ্রুপ ‘জে’-তে নতুন জীবন দিল। শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। সেই ম্যাচ জিততে পারলে শেষ ৩২-এ ওঠার বড় সুযোগ থাকবে আলজেরিয়ার সামনে। আর্জেন্টিনার কাছে বড় হারের পর যে দলকে অনেকে গ্রুপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পথে দেখছিল, তারাই এখন শেষ ম্যাচকে নকআউটের লড়াই বানিয়ে ফেলেছে।
জর্ডানের জন্য বিদায়টা কষ্টের, তবে অপমানের নয়। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে তারা সাহসী ফুটবল খেলেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে যেমন লড়েছে, আলজেরিয়ার বিপক্ষেও তেমনই। আল-তামারি, আল-রাশদানদের পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, বড় মঞ্চে ভয় পাওয়ার দল নয় জর্ডান। কিন্তু দুই ম্যাচে দুই হার তাদের স্বপ্ন ভেঙে দিল।







