১৮ গোলের রেকর্ডের পর ক্লান্ত মেসি, মনে করতে পারলেন না প্রিয় গোল

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
১৮ গোলের রেকর্ডের পর ক্লান্ত মেসি, মনে করতে পারলেন না প্রিয় গোল
লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন লিওনেল মেসি। কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, বিশ্বকাপে করা গোলগুলোর মধ্যে প্রিয় কোনটি, তখন আর্জেন্টাইন অধিনায়কের উত্তর ছিল একেবারেই মানবিক। রেকর্ড গড়ার রাতেও তার মুখে আগে এল ক্লান্তির কথা।

Advertisement

ডালাসে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের দুই গোলই মেসির। ৩৮ মিনিটে প্রথম গোল করে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। যোগ করা সময়ে আরেক গোল করে নিজের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১৮-তে। সেই গোলেই নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের একক সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়ে যান তিনি।

ম্যাচ শেষে নিজের প্রিয় বিশ্বকাপ গোলের প্রশ্নে মেসির সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, ‘আমি খুব ক্লান্ত।’

রেকর্ড গড়ার অনুভূতি নিয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক জানান, জয়ে তিনি খুব খুশি। তার কাছে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন জয়, যার জন্য দলকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সামনে যা আসছে, তার আগে এই জয় আর্জেন্টিনাকে স্বস্তি দেবে বলেও মনে করেন তিনি।

মেসির উত্তরটা যেন ম্যাচের গল্পেরই আরেকটি অংশ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার রাত শুরু হয়েছিল হতাশায়। নবম মিনিটে ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি তিনি। থেমে থেমে নেওয়া দৌড়ের পর বাঁ পায়ের শটটি বাইরে চলে যায়। সেই মুহূর্তে ক্লোসেকে ছাড়ানোর প্রথম সুযোগ হাতছাড়া হয়।

কিন্তু মেসি হতাশা টেনে নেননি। ৩৮ মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার নিচু ক্রস থেকে প্রথম ছোঁয়ার বাঁ পায়ের শটে গোল করে ইতিহাস গড়েন। তখন পুরুষদের বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭। একই সঙ্গে ব্রাজিলের নারী ফুটবল কিংবদন্তি মার্তার ১৭ গোলের পাশেও উঠে যান তিনি।

দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে জুলিয়ান আলভারেসের শট ঠেকার পর বল আবার মেসির সামনে আসে। কাছ থেকে শট নিয়ে জাল খুঁজে নেন তিনি। তাতেই বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮। ক্লোসে ও মার্তা দুজনকেই পেছনে ফেলে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এককভাবে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির শুরুটা অবিশ্বাস্য। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল। দুই ম্যাচে তার গোল ৫টি। আর্জেন্টিনার সব গোলই এখন পর্যন্ত এসেছে তার পা থেকে।

এই ছন্দ তাঁকে শুধু বিশ্বকাপ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে তোলেনি, সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়েও সামনে নিয়ে এসেছে। তবে দৌড়টা সহজ হবে না। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এই বিশ্বকাপে ৪ গোলে পৌঁছেছেন। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল ১৬। নরওয়ের আর্লিং হলান্ডও দুই ম্যাচে ৪ গোল করে দৌড়ে আছেন।

মেসি বয়সে ৩৯-এর দোরগোড়ায়। ২৪ জুন তার জন্মদিন। তবু বিশ্বকাপের মঞ্চে তার প্রভাব কমেনি। বরং ২০২৬ আসরে তিনি আবারও দেখাচ্ছেন, বড় ম্যাচে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম এখনো তিনিই।

মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড বহু বছর পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের বড় মাইলফলক ছিল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে মেসি সেই রেকর্ড ছুঁয়েছিলেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোল করে সেটি ছাড়িয়ে যান। আর দ্বিতীয় গোল করে বিশ্বকাপের সামগ্রিক গোলরেকর্ডও নিজের করে নেন। এখন প্রশ্ন একটাই: এই রেকর্ড কোথায় গিয়ে থামবে?

আর্জেন্টিনার জন্য জয়ের গুরুত্বও কম নয়। অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে তারা দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্টে উঠেছে এবং শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে নামবে লিওনেল স্কালোনির দল। তবে নকআউট পর্বের আগে মেসির বিশ্রামও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি সহজ ছিল না। রালফ রাংনিকের দল হাই প্রেস ও শারীরিক লড়াই দিয়ে আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় অস্বস্তিতে রেখেছিল। মেসিকে শুধু গোল করতে হয়নি, নিচে নেমে বল নিতে হয়েছে, চাপ সামলাতে হয়েছে, সুযোগ তৈরি করতে হয়েছে। ম্যাচ শেষে তাঁর ক্লান্তির কথায় সেই পরিশ্রমের ছবিও স্পষ্ট।

সাধারণত মেসির ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে উত্তর আসে রেকর্ড, ট্রফি, গোল, সহায়তা দিয়ে। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ম্যাচ শেষে তাঁর উত্তরটা ছিল অন্যরকম। ১৮ গোলের রেকর্ড করার পরও তিনি নিজের প্রিয় গোল বেছে নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। কারণ মুহূর্তটা তখনো চলছিল, আর তিনি শুধু সেটি উপভোগ করতে চাইছিলেন সতীর্থদের সঙ্গে।

ম্যাচ শেষে ১৮ বিশ্বকাপ গোলের মধ্যে প্রিয় গোল কোনটি, এমন প্রশ্নে মেসি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই। সত্যি বলতে, আজ আমার মনে নেই। সত্যি বলতে, আমি ক্লান্ত, শক্তি কমে গেছে। তাই ভাবা কঠিন।’

এরপর মেসি যোগ করেন, ‘আমি এই মুহূর্তটা উপভোগ করছি এবং সতীর্থদের সঙ্গে থাকতে চাই।’

মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে স্মরণীয় গোলের অভাব নেই। ২০০৬ সালে তরুণ বয়সের গোল, ২০১৪ সালে দলকে টেনে নেওয়া গোল, ২০২২ সালে নকআউটের গোল, আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে রেকর্ডগড়া গোল, সবই আলাদা গল্প। কিন্তু ডালাসের রাত শেষে মেসির কাছে সবচেয়ে জরুরি ছিল দল ও মুহূর্তটি।