মেসির রেকর্ডগড়া গোল নিয়ে রাংনিক-শ্মাইকেলের প্রশ্ন

লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ ইতিহাস গড়া গোল নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়ে মেসির প্রথম গোলটি তাকে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা বানিয়েছে। কিন্তু সেই গোলের আগে আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় ফাউল ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অস্ট্রিয়া কোচ রালফ রাংনিক। একই প্রশ্ন তুলেছেন কিংবদন্তি গোলরক্ষক পিটার শ্মাইকেলও।
ডালাসে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে ৩৮ মিনিটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন মেসি। ফাকুন্দো মেদিনার নিচু ক্রস থেকে প্রথম ছোঁয়ায় বাঁ পায়ের শটে গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এই গোলেই তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। একই সঙ্গে ব্রাজিলের নারী ফুটবল কিংবদন্তি মার্তার ১৭ গোলের পাশেও উঠে যান। পরে যোগ করা সময়ে আরেক গোল করে নিজের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৮-তে নিয়ে যান মেসি এবং নারী-পুরুষ মিলিয়েও এককভাবে শীর্ষে ওঠেন।
তবে অস্ট্রিয়ার দাবি, মেসির প্রথম গোলের আগে আর্জেন্টিনার আক্রমণ শুরু হওয়ার সময় অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের চ্যালেঞ্জে জাভার শ্লাগার ফাউলের শিকার হন। রেফারি খেলা চালিয়ে যান। ভিডিও সহকারী রেফারির পক্ষ থেকেও হস্তক্ষেপ করা হয়নি। এরপরই আর্জেন্টিনা আক্রমণ গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত গোলটি করেন মেসি।
ম্যাচ শেষে রাংনিক বলেন, প্রথম গোলের ক্ষেত্রে তিনি চাইতেন চতুর্থ কর্মকর্তা যেন পেনাল্টির সময়ের মতো ঘটনাটি দেখেন। তার মতে, দেখলেই বোঝা যেত শ্লাগারের ওপর ফাউল হয়েছিল। অস্ট্রিয়া কোচ সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেও নিজের দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টির কথাও বলেছেন।
রাংনিক মেসির শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করেননি। বরং আর্জেন্টাইন অধিনায়কের প্রশংসাও করেছেন। তার মতে, ৩৯ বছর বয়সের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের শুরুতেই দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করতে পারা পার্থক্য গড়ে দেয়। মেসি আলাদা মানের খেলোয়াড়, সেরাদের একজন, হয়তো সেরা—এমন মন্তব্যও করেন অস্ট্রিয়া কোচ।
তবু প্রথম গোলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রেখে গেছেন রাংনিক। তার মতে, আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোল অস্ট্রিয়ার নিজেদের ভুলে হয়েছে, কিন্তু প্রথম গোলের আগে শ্লাগারের ওপর সম্ভাব্য ফাউলটি দেখা উচিত ছিল।
এই বিতর্ককে আরও বড় করেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ডেনমার্কের সাবেক গোলরক্ষক পিটার শ্মাইকেল। ফক্স স্পোর্টসের আলোচনায় তিনি বলেন, মেসির কৃতিত্ব কমাতে চান না, তবে তার মনে হয়েছে গোলটি দাঁড়ানো উচিত ছিল না।
শ্মাইকেলের দাবি, ম্যাক অ্যালিস্টারের চ্যালেঞ্জটি ফাউল ছিল এবং সেখান থেকেই আর্জেন্টিনার গোলের আক্রমণ তৈরি হয়। তার মতে, রেফারির স্পষ্ট ভুল ভিডিও সহকারী রেফারির দেখা উচিত ছিল। অস্ট্রিয়ার জন্য বিষয়টি হতাশাজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শ্মাইকেলের মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিতর্ক বাড়ে। অনেকেই দাবি করেন, গোলের আগে ম্যাক অ্যালিস্টারের চ্যালেঞ্জটি ফাউল ছিল। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, পেনাল্টির ক্ষেত্রে ভিডিও সহকারী রেফারি হস্তক্ষেপ করলেও গোলের আগে অস্ট্রিয়ার পক্ষে সম্ভাব্য ফাউল কেন দেখা হলো না। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের অনেকের মতে, চ্যালেঞ্জটি খুব জোরালো ছিল না এবং রেফারির খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়।
বিতর্কের মূল জায়গাটিও এখানেই। যদি রেফারি সঙ্গে সঙ্গে ফাউল দিতেন, তাহলে আর্জেন্টিনার আক্রমণই শুরু হতো না। কিন্তু মাঠের সিদ্ধান্ত ছিল খেলা চালিয়ে যাওয়া। ভিডিও সহকারী রেফারি সেটিকে স্পষ্ট ভুল মনে করেনি বলেই গোল বহাল থাকে।
ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী গোলের আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার পর্যায়ে গুরুতর ও স্পষ্ট ভুল থাকলে ভিডিও সহকারী রেফারি হস্তক্ষেপ করতে পারে। অস্ট্রিয়ার দাবি, এখানে সেটিই হওয়া উচিত ছিল। তবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গোলটি বৈধ। তাই চূড়ান্ত ফল বা রেকর্ডে কোনো পরিবর্তন নেই।
ম্যাচের শুরুতেও ভিডিও সহকারী রেফারি আলোচনায় ছিল। নবম মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসকে ফাউলের ঘটনায় আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি মেসি। তাঁর বাঁ পায়ের শট বাইরে চলে যায়। কিন্তু পরে তিনিই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। ৩৮ মিনিটে রেকর্ডগড়া গোল, এরপর যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় গোল।
আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘জে’-তে শক্ত অবস্থানে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মেসি চলতি বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে করেছেন ৫ গোল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল—আর্জেন্টিনার সব গোলই এখন পর্যন্ত এসেছে তার পা থেকে।






