আর্জেন্টিনাকে থামানোর সূত্র দেখাল অস্ট্রিয়া ম্যাচ?

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
আর্জেন্টিনাকে থামানোর সূত্র দেখাল অস্ট্রিয়া ম্যাচ?
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। ছবি: সংগৃহীত

লিওনেল মেসির রেকর্ডগড়া গোল নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩৮ মিনিটে তাঁর বাঁ পায়ের নিখুঁত শট শুধু বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ডই গড়েনি, আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধরন নিয়েও নতুন করে আলোচনার দরজা খুলেছে। প্রশ্ন উঠছে, এই গোল কি শুধুই মেসির অসাধারণ ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল, নাকি এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আর্জেন্টিনাকে থামানোর সূত্র?

Advertisement

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি দেখতে সহজ, কিন্তু পরিকল্পনায় ছিল সূক্ষ্ম। বাঁ দিক দিয়ে উঠে যান ফাকুন্দো মেদিনা। শেষ তৃতীয়াংশে গিয়ে তিনি বল পেছনে কাট করেন। বলটি সরাসরি মেসির দিকে যাওয়ার আগে থিয়াগো আলমাদা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বল ছেড়ে দেন। এরপর মেসির প্রথম ছোঁয়ার বাঁ পায়ের শট। পুরো দৃশ্যটি দেখতে এক মুহূর্তের সৌন্দর্য মনে হলেও এর পেছনে ছিল আর্জেন্টিনার পরিচিত আক্রমণ-রুটিন।

দ্য অ্যাথলেটিকের মতে, স্কালোনির আর্জেন্টিনা প্রান্ত ধরে উঠে বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করতে পছন্দ করে। বিশেষ করে ফুলব্যাক বা উইংয়ের খেলোয়াড় যখন ওপরে ওঠেন, তখন তারা সব সময় উঁচু ক্রস দেন না। বরং অনেক সময় ডি-বক্সের ভেতরে বা আশপাশে পেছনে কাটব্যাক দেওয়ার মতো পাস খোঁজেন। এই ধরনের পাসে ডিফেন্ডারদের দিক বদলাতে হয়, গোলরক্ষকের প্রতিক্রিয়া কঠিন হয় এবং পেছন থেকে আসা খেলোয়াড় প্রথম ছোঁয়ায় শট নেওয়ার সুযোগ পান।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির গোলটি সেই ধরনটিরই পরিষ্কার উদাহরণ। মেদিনা বাঁ দিক থেকে জায়গা বানান। অস্ট্রিয়ার রক্ষণ তখন নিজেদের গোলমুখের দিকে ছুটছে। এমন অবস্থায় মেদিনা বল পেছনে কাট করেন। আলমাদার বল ছেড়ে দেওয়ায় অস্ট্রিয়ার রক্ষণ আরও বিভ্রান্ত হয়। মেসি জায়গা বুঝে ঠিক সময়েই ডি-বক্সের ভেতরে ঢোকেন। এরপর শট ছিল তার স্বাভাবিক ঠান্ডা মাথার কাজ।

এখানে মেসির শট নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু গোলটি শুধু ব্যক্তিগত ঝলকও নয়। আর্জেন্টিনা তাকে যে জায়গায় বল পেতে চায়, সেই জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুরো আক্রমণটি তৈরি করেছে। অর্থাৎ, মেসির জাদু আছে, কিন্তু সেই জাদু বের করে আনার জন্য স্কালোনির দলের পরিষ্কার কাঠামোও আছে।

এই কারণেই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ: আর্জেন্টিনাকে থামাতে হলে কি আগে প্রান্ত থেকে পেছনে কাটব্যাক দেওয়া পাস বন্ধ করতে হবে?

উত্তর সহজ নয়, তবে সূত্রটা গুরুত্বপূর্ণ। আর্জেন্টিনা শুধু মাঝখানের ছোট পাসে আক্রমণ করে না। তারা প্রতিপক্ষের রক্ষণকে একদিকে টেনে নিয়ে প্রান্তে বাড়তি খেলোয়াড় তৈরি করে। ফুলব্যাক বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার শেষ তৃতীয়াংশে জায়গা পেলে মেসি, আলমাদা, লাউতারো মার্তিনেস বা ম্যাক অ্যালিস্টাররা ডি-বক্সের ভেতরে ঢোকার পথ খোঁজেন। ফলে রক্ষণ যদি শুধু মেসির ওপর নজর রাখে, প্রান্তের খেলোয়াড় জায়গা পেয়ে যায়। আবার প্রান্তের খেলোয়াড় আটকাতে গেলে ডি-বক্সের ভেতরে মেসি জায়গা পেয়ে যান।

অস্ট্রিয়া ম্যাচে রালফ রাংনিকের দল বেশ কিছু সময় হাইপ্রেস দিয়ে আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে রেখেছিল। তারা মাঝমাঠে শারীরিক লড়াই করেছে, আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ে ওঠার পথ ভাঙার চেষ্টা করেছে। তবু একবার উইংয়ে জায়গা খুলতেই আর্জেন্টিনা নিজেদের সবচেয়ে পরিচিত অস্ত্র ব্যবহার করেছে। সেটিই গোল।

এই গোলের আগে ফাউল ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্কও আছে। অস্ট্রিয়ার দাবি, আর্জেন্টিনার আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই জাভার শ্লাগারের ওপর ফাউল হয়েছিল। রাংনিকও বলেছেন, ঘটনাটি দেখা উচিত ছিল। তবে মাঠের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গোলটি বহাল থাকে। বিতর্ক আলাদা, কিন্তু ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে গোলটি আর্জেন্টিনার আক্রমণ-পরিচয় নিয়ে বড় ইঙ্গিত দেয়।

এমন আক্রমণ আর্জেন্টিনার কাছে নতুন নয়। উইং ধরে এগিয়ে পেছনে কাটব্যাক পাস, এরপর ডি-বক্সে ঢুকে আসা খেলোয়াড়ের দ্রুত শট—এই ছক তারা আগেও ব্যবহার করেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির গোলটি সেই পরিচিত রুটিনের বড় মঞ্চের সংস্করণ।

নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষরা তাই সতর্ক থাকবে। মেসিকে থামাতে হলে শুধু তাঁকে একজন দিয়ে পাহারা দিলেই হবে না। আর্জেন্টিনার উইং দিয়ে এগোনো, ফুলব্যাকের ওঠা, ডি-বক্সের ভেতরে পাসের পথ এবং পেছন থেকে ঢুকে আসা খেলোয়াড়দের ওপরও নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে বাঁ দিক থেকে মেদিনা বা অন্য কোনো ফুলব্যাক যখন উঠে আসবেন, তখন ডি-বক্সের ভেতরে মেসি কোথায় দাঁড়াচ্ছেন, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।

তবে এই পরিকল্পনা থামানো কঠিন। কারণ আর্জেন্টিনা পেছনে কাটব্যাক পাস বন্ধ হলে মাঝখান দিয়ে ছোট পাসে যেতে পারে। মাঝখান বন্ধ হলে দ্রুত দিক বদলাতে পারে। আর সব বন্ধ করলেও মেসির এক ছোঁয়া, এক শরীরী ভঙ্গি, এক শট ম্যাচ বদলে দিতে পারে। তাই আর্জেন্টিনাকে থামানোর সূত্র দেখা গেলেও সেটি বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন।

অস্ট্রিয়া ম্যাচ দেখাল, আর্জেন্টিনাকে আটকাতে প্রতিপক্ষদের তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, উইংয়ে সহজে ফুলব্যাককে উঠতে দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, ডি-বক্সের ভেতরে পেছনে কেটে দেওয়া পাসের জায়গা বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, মেসিকে শুধু বল পেলে নয়, বল আসার আগেই অনুসরণ করতে হবে। কারণ মেসি শট নেওয়ার আগে জায়গা নেন, তারপর গোল করেন।


স্কালোনির দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে শুধু মেসির ওপর নির্ভর করে নয়, বরং মেসিকে সবচেয়ে কার্যকর জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা দিয়ে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোলটি সেই সত্য আবারও দেখিয়েছে। দেখতে ছিল এক মুহূর্তের সৌন্দর্য, কিন্তু ভেতরে ছিল বহুবার অনুশীলন করা ছক।

তাই অস্ট্রিয়া ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে থামানোর পথ দেখিয়েছে কি না, উত্তর হলো: আংশিকভাবে হ্যাঁ। প্রতিপক্ষরা জানল, উইং থেকে পেছনে কেটে দেওয়া পাস আটকানো জরুরি। কিন্তু সমস্যা হলো, জানা আর থামানো এক জিনিস নয়। আর্জেন্টিনা জানে কোথায় ফাঁক তৈরি করতে হয়, আর মেসি জানেন সেই ফাঁককে কীভাবে ইতিহাসে পরিণত করতে হয়।