Advertisement

ডেভিড হার্স্টের কলাম/মক্কা চুক্তি: শক্তির প্রয়োজনীয় প্রদর্শনী কেন জরুরি

ডেভিড হার্স্ট
মক্কা চুক্তি: শক্তির প্রয়োজনীয় প্রদর্শনী কেন জরুরি
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকার দুর্বলতাই মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন মেরুকরণের পথ তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের শীর্ষ তিন শক্তি ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের চক্র ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার তিন বছর পূর্ণ হবে। অধিকৃত পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন ও ইরানেও তারা একই ধরনের যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছে।

Advertisement

এই দীর্ঘ সময়ের বেশির ভাগ অংশজুড়েই তুরস্ক এবং আরব বিশ্ব কেবল আতঙ্কিত হয়ে বসে ছিল। কার্যত তারা কিছুই করেনি। অক্ষমের আর্তনাদের মতো তাদের একটাই কথা ছিল, ‘আমরা কী করতে পারি? ইসরায়েলের সঙ্গে কি যুদ্ধ শুরু করে দেব?’

আঙ্কারায় এই কথাটি বারবার শোনা যেত। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা আজারবাইজানের তেল নিজেদের একটি বন্দর দিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

তবে তুরস্ক ইরানি কুর্দি মিলিশিয়াদের দিয়ে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র স্থল হামলা প্রতিহত করেছিল। অন্যদিকে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বেশ দৃঢ়ভাবেই অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

কিন্তু গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অঞ্চলকে নতুন করে সাজানোর একচ্ছত্র স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। দক্ষিণ সিরিয়ার বড় একটি অংশে তিনি আগ্রাসন চালিয়েছেন। একই সঙ্গে একটি নতুন উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলারও চেষ্টা করেছেন। এর মাধ্যমে মাত্র ৭০ লাখের বেশি ইসরায়েলি ইহুদি সাড়ে ৪৫ কোটি আরবের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে।

গত সপ্তাহেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।

যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পেছনে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত কোন কারণে তিনি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে বাধ্য হলেন, তা হয়তো ঐতিহাসিকেরা ভবিষ্যতে বিশ্লেষণ করবেন।

তবে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে আমি বলব, চীন বিষয়টি ঠিকঠাক বুঝতে পেরেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। তবে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়া বিষয়টি এভাবেই তুলে ধরেছে, ‘আমেরিকা অবিশ্বস্ত: প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান।’

চীন চাইলে এই চুক্তিটিকে একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং তারা এই চুক্তিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবেই দেখছে।

সিনহুয়া সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের ইমেরিটাস ডিন ইয়ান শুয়েতংয়ের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধ মার্কিন সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা আরব দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তারা শুধু ওয়াশিংটনের প্রকৃত সামরিক শক্তি নিয়েই নয়, বরং নিজেদের রক্ষা করার মার্কিন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

শুয়েতং বলেন, এই অঞ্চলের দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না, বরং নিজেদের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হবে।’

একটি দুর্ধর্ষ চুক্তি?

অন্তত কাগজ-কলমে এই তিন শক্তির মধ্যকার সামরিক চুক্তিটিকে বেশ দুর্ধর্ষই মনে হয়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের জিডিপি যথাক্রমে ৪৫২ বিলিয়ন, ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন এবং ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এই তিন দেশ মিলে যুদ্ধক্ষেত্রে ৫ হাজার ৬০০টির বেশি প্রধান যুদ্ধট্যাঙ্ক, ১ হাজার ১০০টির বেশি যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী ড্রোনের বহর, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নামাতে সক্ষম। পাশাপাশি তাদের সম্মিলিত সেনাসংখ্যাও ১০ লাখের বেশি।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার প্রতিটি দেশেরই আলাদা আলাদা লক্ষ্য রয়েছে।

অন্তত দুটি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা পাকিস্তানের অর্থের প্রয়োজন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেখতে পাচ্ছে যে তাদের সামরিক শক্তি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। এমনটাই জানিয়েছেন এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

ভারতের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্যও পাকিস্তানের জন্য জরুরি। নয়াদিল্লির চোখও এ বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল এই চুক্তিকে ‘ভারতের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক এক ঘটনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত বিকল্পগুলোর বিস্তার ঘটানো উচিত।

তুরস্কেরও একটি পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে, ইসরায়েলের নিয়মিত হুমকির মুখে এটি তাদের জন্য বেশ জরুরি। সিরিয়ার নতুন সরকারকে সাহায্য করার জন্যও তাদের এই সক্ষমতা দরকার, যাতে দক্ষিণ সিরিয়া থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে হটানো যায়।

তুরস্কের দ্রুত বর্ধনশীল সামরিক শিল্পকারখানার জন্যও নতুন বাজার প্রয়োজন।

এই সামরিক চুক্তির যদি একজন প্রধান রূপকার থেকে থাকেন, তবে তিনি হলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এরদোয়ান রিয়াদে উড়ে যাওয়ার এক দিন আগেই ফিদান ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়ার বিপদের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সতর্ক করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়াকেই ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। এ পর্যন্ত তারা অন্য দেশে থাকা সম্পদসহ নিজেদের হাতে থাকা বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে একটি মোহ বা বিভ্রম তৈরি করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা এই বিভ্রমের ওপর ভিত্তি করে এমন এক রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তুলেছে, যা ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের পক্ষেই কাজ করে। তারা গণহত্যা চালায়, অথচ এরপরও তাদের কিছুই হয় না।’

ফিদানের এই বক্তব্যের নিহিত অর্থ হলো, ইসরায়েলের এই অবাধ ছাড় পাওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে।

ইরান এবং ইয়েমেনের হুতিদের (যাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ) মোকাবিলায় সৌদি আরবেরও একটি জোরালো প্রভাবক প্রয়োজন। সম্প্রতি হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি তারা সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রগুলোতেও বোমাবর্ষণ শুরু করেছে।

চারপাশের এসব চলমান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের আধুনিকায়নে যুবরাজের যে পরিকল্পনা, তা বারবার বাধার মুখে পড়ছে। তবে এই সবকিছুর মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র হলো, আমেরিকা এখন এক অবিশ্বস্ত নিরাপত্তা অংশীদারে পরিণত হয়েছে।

অবিশ্বস্ত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র

এই ঘটনাগুলোর পেছনে একটি স্পষ্ট উপসংহার লুকিয়ে আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আমেরিকা, যারা ঔপনিবেশিক ক্ষমতা হস্তান্তরের চেষ্টায় মগ্ন, তারা তাদের সবচেয়ে কাছের মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ বা অনিচ্ছুক। অথচ নিজেদের পিছু হটার এই সময়ে ইসরায়েলকে আমেরিকার আগের চেয়ে আরও বেশি প্রয়োজন।

আমেরিকার আরব মিত্ররা এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এই সত্যটি উপলব্ধি করছে।

জুনে ইরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারক সই করেছিলেন, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধীরা মিলে কার্যত তা ভেস্তে দিয়েছে। ওই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে ইসরায়েলের হামলাসহ সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করতে বাধ্য ছিল।

যে গোষ্ঠীটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল, ওয়াশিংটন প্রশাসনের ভেতরে থাকা তাদেরই এক বিরোধী গোষ্ঠীর সহায়তায় ইসরায়েল একটি নতুন চুক্তি করে। তবে লেবানন সরকারের সঙ্গে নয়, লেবানন প্রেসিডেন্সির সঙ্গে এই চুক্তি করা হয়। এটি দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলকে তাদের দখলদারি এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প একটি নতুন দাবি জুড়ে দেন। তিনি শর্ত দেন যে রিয়াদকে আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। অথচ এই শর্তটি ওই আলোচনা বা চুক্তির কোনো অংশ ছিল না। মূলত ইসরায়েলি লবিংয়ের কারণেই এই শর্ত যুক্ত করা হয়।

এরপর গাজায় হামাসের সঙ্গে ‘বোর্ড অব পিস’-এর স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়টি সামনে আসে। ওই চুক্তিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে রাজি হয়েছিল, তবে তারা পুরোপুরি নিরস্ত্র হওয়ার শর্ত মানেনি।

ওই চুক্তিতে বলা ছিল, গাজার নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের কাছে হামাস তাদের ভারী অস্ত্র জমা দেবে। এসব অস্ত্রের তালিকা করে সংরক্ষণ করা হবে। তবে সেটি কেবল ইসরায়েলি বাহিনীর পুরোপুরি প্রত্যাহারের পরই ঘটবে। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষমতাহীন ‘বোর্ড অব পিস’ চুক্তির এই বয়ানটি নতুন করে লেখে।

নতুন করে লেখা ওই চুক্তিতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার কাজ একই সঙ্গে চলবে। এ ছাড়া হালকা ও ভারী সব ধরনের অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলতে হবে। এগুলো কেবল তালিকাভুক্ত করে সংরক্ষণ করলে চলবে না।

চুক্তিটি নতুন করে লিখিয়েও ইসরায়েল সন্তুষ্ট হতে পারেনি, বরং তারা এখন এই চুক্তি পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের বোর্ড যে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিল, রোববার নেতানিয়াহু তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

ইরানে যুদ্ধের পাঁচ মাস চলছে।

এর পাশাপাশি আর মাত্র তিন মাস পরই নির্বাচন, যেখানে কংগ্রেসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রবল ঝুঁকি রয়েছে ট্রাম্পের। এমন অবস্থায় তিনি চাইলেও নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থানে নেই।

স্পষ্টতই, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে। তবে ইসরায়েলি এই মিত্রকে দমানোর জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়। বরং ট্রাম্পের দুর্বলতাই নেতানিয়াহুকে আরও উসকে দিচ্ছে। ট্রাম্পের বারবার মন বদলানোর বিষয়টি নেতানিয়াহু ঠিক একইভাবে সামলান, যেভাবে তিনি জো বাইডেনের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন।

নভেম্বরের নির্বাচনে নিজের পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি এখন বেশ অনিশ্চিত। এ অবস্থায় চরম ডানপন্থীদের সঙ্গে রাখতে মরিয়া নেতানিয়াহু। মাত্র কয়েক দিন আগে ট্রাম্প যেটিকে ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার দিকে এক বড় ধাপ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, নেতানিয়াহু দ্বিধাহীনভাবেই সেটিকে বড় ধরনের এক পিছু হটায় পরিণত করেন।

তিনি বলেন, ‘হামাস সত্যিকারের অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত’ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কোনোভাবেই গাজা ছাড়বে না। ‘আমাদের বাহিনী ও নাগরিকদের ওপর আসা হুমকি রুখতে’ গাজায় আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

গাজা কিংবা ইরান, কোনো বিষয়েই ট্রাম্পের কথা শুনছে না তেল আবিব। বাইডেনের সঙ্গে যা করেছিলেন, নেতানিয়াহু এখন একইভাবে ট্রাম্পেরও পরীক্ষা নিচ্ছেন। ইসরায়েলের ওপর প্রকৃত চাপ প্রয়োগে ট্রাম্প কতটা ইচ্ছুক, তিনি সেটাই দেখতে চাইছেন।

ট্রাম্পকে এখন নিজেদের লোক দিয়ে ঘিরে রেখেছেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যানের তথ্যমতে, সেখানে একটি সুসংগঠিত চক্র কাজ করছে। ইরানের বোমা কর্মসূচি নিয়ে সম্পূর্ণ বানোয়াট উদ্ধৃতিগুলো তারা বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। আর ফক্স নিউজের মতো মাধ্যমগুলো এসব বানানো তথ্যকেই সত্য হিসেবে প্রচার করছে।

জানুয়ারির ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী প্রজাতন্ত্রটি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে সামান্য ধাক্কা দিলেই তার পতন ঘটবে। ইসরায়েলের এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন।

কিন্তু ঘটেছে ঠিক এর উল্টোটা।

ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য

টানা সামরিক হামলার মুখে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আরও শক্তিশালী হয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে এখন ট্রাম্পকে শর্ত দেওয়ার মতো অবস্থানে আছে বলে মনে করছে তারা।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলগদর শনিবার বলেন, প্রণালিটি পুনরায় খোলার আগে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই তাদের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এ ছাড়া এই অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদও ছেড়ে দিতে হবে।

রোববার আইআরজিসি জানায়, তারা এখন এই প্রণালিটিকে শুধু একটি জলপথ হিসেবে নয়, বরং ‘যুদ্ধের ময়দান’ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, জুনে সই হওয়া চুক্তির শর্তগুলো ওয়াশিংটন মেনে নিলেই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে।

পুনরায় যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প পিছপা হচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে নিজের শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানকে রাজি করানোও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

ট্রাম্প মাত্র যে চুক্তিতে সই করেছেন, সেখান থেকে তাঁকে সরে আসা থেকে ঠেকাতে মক্কা চুক্তি কি কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে? অথবা কোনো অস্ত্রবিরতি নস্যাৎ করা থেকে কি ইসরায়েলকে থামাতে পারবে?

তাৎক্ষণিকভাবে তা সম্ভব নয়।

শুধু রোববারই হুতিরা জানিয়েছে, তারা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের মোকা শহরে জড়ো হওয়া সৌদি সেনাদের লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

কিন্তু এই জোটটি যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তবে এটি ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক আলোচকদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের কাজ করার জায়গাও সংকুচিত হয়ে আসবে।

গাজার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট ছিল যে বাইডেন বা ট্রাম্পের চেয়ে নেতানিয়াহুর লক্ষ্যটি একেবারেই আলাদা।

যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে ‘বোর্ড অব পিস’ একটি বিভ্রমের মধ্যে রয়েছেন। তারা মনে করেন, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য হামাসকে নিরস্ত্র করা। আর সেটি হলেই তারা সৈন্য প্রত্যাহার করবে। এই তিন পক্ষই মনে করে, যুদ্ধ একটি সাময়িক বিষয়।

ইসরায়েলের উদ্দেশ্য এর চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।

হামাস যদি নিরস্ত্রও হয়, ইসরায়েল গাজায় তাদের ছায়াগোষ্ঠীগুলোকে (প্রক্সি মিলিশিয়া) অস্ত্র দেওয়া চালিয়ে যাবে। এটি এমন এক গৃহযুদ্ধের ইন্ধন জোগাবে, যা দ্রুতই গাজার একটি বড় অংশকে সমুদ্রে ও চিরস্থায়ী নির্বাসনে ঠেলে দেবে।

গাজা থেকে বড় পরিসরে ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের’ বিষয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রীরা কখনোই তেমন রাখঢাক করেননি। আর এখনো সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেনাকেম বেগিনের শাসনামলে ১৯৮২ সালে বৈরুতে যা ঘটেছিল, সেটিই হতে পারে গাজার পরিণতি।

নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা

বৈরুত থেকে ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) সরে যাওয়ার আগে, তারা নিরাপদে প্রস্থান এবং শরণার্থীশিবিরে থাকা ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ইসরায়েলের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চেয়েছিল। এই নিশ্চয়তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরেরও গ্যারান্টি থাকার কথা ছিল।

প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের লেবাননবিষয়ক বিশেষ মধ্যস্থতাকারী ফিলিপ হাবিবের লেখা দুটি চিঠিতে এসব নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ ছিল।

ফিলিস্তিনের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের মধ্যস্থতাকারী দল বারবার জানিয়েছিল, তাদের সৈন্য প্রত্যাহারের অন্যতম শর্ত হলো, শরণার্থী শিবিরে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পিএলও চলে গেলে লেবানিজ খ্রিষ্টান ফ্যালাঞ্জ তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পাবে—এই ভয় ফিলিস্তিনিরা কখনোই গোপন করেননি।

হাবিবের ওই আলোচনায় বেগিন এবং ফ্যালাঞ্জের নেতা বশির জেমায়াল দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। বেগিনের উত্তরের ওপর ভিত্তি করে, যা জেমায়ালও সমর্থন করেছিলেন, হাবিব এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পিএলওকে গ্যারান্টি দিয়েছিল।

১৪ সেপ্টেম্বর জেমায়ালকে হত্যা করা হয় এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বৈরুতে প্রবেশ করে।

এর পরের দিন, ইসরায়েলি এক জেনারেল ট্যাংকে বসে ফ্লেয়ার জ্বালিয়ে ফ্যালানজিস্টদের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থীশিবিরে ঢোকার পথ দেখিয়েছিলেন। এই জেনারেলই পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন; অ্যারিয়েল শ্যারন।

মাত্র দুদিনের মধ্যে দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং লেবানিজ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়। ওই বছরের শেষের দিকে, মার্কিন সাংবাদিক মিল্টন ভিওর্স্ট এই গণহত্যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনীতিক চার্লস হিলের কাছে তুলে ধরেছিলেন।

ভিওর্স্টকে দেওয়া হিলের সেই উত্তরটি আজও বেশ প্রাসঙ্গিক।

হিল বলেছিলেন, ‘আইনগত দিক থেকে আমরা পিএলওকে দেওয়া আমাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিনি। আমরা নিজেরা কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমরা বলেছিলাম যে অন্যদের কাছ থেকে আমরা নিশ্চয়তা পেয়েছি। আর ওই সময়ে ওই অঞ্চলে আমাদের নিজস্ব কোনো সশস্ত্র বাহিনী না থাকায়, আমাদের নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার কোনো উপায় ছিল না। আমরা পিএলও-কে শুধু এটুকু বলেছিলাম যে, অন্যরা আমাদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা তা রক্ষা করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে বৈরুত ছেড়ে আসার বিষয়ে পিএলওর সিদ্ধান্তটি আমাদের কথার ওপরই নির্ভরশীল ছিল। তা না হলে পরিস্থিতি হয়তো অন্যভাবে মোড় নিত। সাবরা ও শাতিলার খবর যখন ছড়িয়ে পড়ে, বেগিন তখন ইসরায়েলকে দায়ী করার বিষয়টিকে একটি রক্তপিপাসু অপবাদ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ভবনে বসে আমরা অনুভব করেছিলাম, যা ঘটেছে তার জন্য আমাদের একটি দায়বদ্ধতা আছে। নৈতিকভাবে আমরা তাদের হতাশ করেছি।’

সাবরা ও শাতিলায় যা ঘটেছিল, তা ফিলিস্তিনিদের স্মৃতিতে একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। হামাস বা গাজার জনগণের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের এর পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া উচিত নয়।

মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ব্যবস্থার সূচনা, যা বহু দিন ধরে খুবই প্রয়োজন ছিল। এতে যুক্ত হওয়াটা মিসরের জন্যও ভীষণ লাভজনক। কারণ, দিন শেষে মূল বিষয়টি আমেরিকার পতন বা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর যা খুশি তা করে পার পেয়ে যাওয়া নিয়ে নয়।

শেষ পর্যন্ত এর মূল অর্থ হলো নিজেদের মাটি ও নিজেদের মানুষের ওপর আরব এবং তুরস্কের সার্বভৌমত্ব।

হয় ইসরায়েলের খেয়ালখুশিমতো যুদ্ধ শুরুর মাধ্যমে এই অঞ্চলকে আরেকটি শতক ধরে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের নিচে নিষ্পেষিত হতে হবে, নয়তো এই অঞ্চলের শীর্ষ তিন শক্তিকে এখন সেই চক্র ভাঙার সময় এসেছে।

সামরিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিকভাবে এতটা শক্তিশালী একটি চুক্তি যদি এর শাসকদের স্রেফ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রথম বাধাতেই মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে প্রতিটি আরব সরকারই জানে, ইসরায়েলের ইন্ধনে সৃষ্ট কোনো যুদ্ধের পরবর্তী শিকার হবে তারাই।


লেখক পরিচিতি:

ডেভিড হার্স্ট ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। তিনি এই অঞ্চল নিয়ে একজন বিশ্লেষক ও বক্তা এবং সৌদি আরব বিষয়ে পারদর্শী। এর আগে তিনি ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রধান পররাষ্ট্রবিষয়ক লেখক ছিলেন এবং রাশিয়া, ইউরোপ ও বেলফাস্টে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। ‘দ্য স্কটসম্যান’-এর শিক্ষাবিষয়ক প্রতিবেদক থাকা অবস্থায় তিনি গার্ডিয়ানে যোগ দেন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]