জন্মদিনে ফেরাউনের মুখমণ্ডলে সূর্যালোক পড়ার বিরল দৃশ্য দেখল হাজারো মানুষ

প্রাচীন মিশরের স্থাপত্যশৈলী, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ধর্মীয় বিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয় আবারও মুগ্ধ করল বিশ্ববাসীকে। আর তা হলো- জন্মদিনে সূর্যের সোনালি রশ্মি মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করে আলোকিত করল ফেরাউনের (দ্বিতীয় রামেসিস) মুখমণ্ডল। এই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ভোরে মিশরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আসওয়ান প্রদেশের ঐতিহাসিক আবু সিম্বেল মন্দিরে সমবেত হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সাত হাজারেরও বেশি পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৫৩ মিনিটে সূর্যের আলো মন্দিরের প্রবেশপথ পেরিয়ে প্রায় ৬০ মিটার ভেতরে অবস্থিত উপাসনাকক্ষে পৌঁছায়। প্রায় ২০ মিনিট স্থায়ী হয় এই দৃশ্য। কক্ষের চারটি দেবমূর্তির মধ্যে তিনটি সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। হাজার বছরের প্রাচীন এই বিস্ময় প্রকৃতি ও মানুষের অসাধারণ নির্মাণকৌশলের এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
তিন দেবমূর্তি আলোকিত, অন্ধকারেই দেবতা পতাহ
আবু সিম্বেল মন্দিরের অভ্যন্তরের পবিত্র কক্ষে পাশাপাশি স্থাপিত চারটি মূর্তির মধ্যে সূর্যের আলো পড়ে ফারাও রাজা দ্বিতীয় রামেসিস, দেবতা আমুন-রে এবং রে-হোরাখতির মূর্তিতে। তবে চতুর্থ মূর্তি অন্ধকার ও পাতালের সঙ্গে সম্পর্কিত দেবতা পতাহ থেকে যায় অন্ধকারে।
মিশর থেকে দেশে ফিরলেন ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া আরও ৪১ বাংলাদেশি
প্রাচীন মিশরীয়রা কীভাবে সূর্যের গতিপথ, মন্দিরের অবস্থান ও স্থাপত্যের বিন্যাসের মধ্যে এমন নিখুঁত সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, তা আজও গবেষক ও প্রকৌশলীদের বিস্মিত করে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলো মন্দিরের গভীরতম কক্ষে পৌঁছানোর এই ব্যবস্থা প্রাচীন মিশরীয়দের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রকৌশল দক্ষতার এক অসামান্য নিদর্শন। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি ও ২২ অক্টোবর আবু সিম্বেল মন্দিরে এই বিরল সূর্যালোকের ঘটনা ঘটে। অক্টোবরের ঘটনাটিকে দ্বিতীয় রামেসিসের জন্মদিনের স্মারক এবং ফেব্রুয়ারির ঘটনাটিকে তাঁর সিংহাসনে আরোহণের দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।
সাগরে নৌযান বিকল, মিশর উপকূলে বাংলাদেশিসহ ৫৪ জন উদ্ধার
পর্যটকদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি
বিরল এই দৃশ্যকে কেন্দ্র করে লোহিত সাগর তীরে অবস্থিত আবু সিম্বেল এলাকায় নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। মিশরীয় সংবাদমাধ্যম ' আল-আহরাম অনলাইন' এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসওয়ানের গভর্নর আমর লাশিন জানিয়েছেন, সূর্য উৎসব উপলক্ষে প্রায় সাত হাজার বিদেশি পর্যটক মন্দিরটি পরিদর্শন করেন। এর আগের দিন বুধবার ১০টি ফ্লাইটে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আবু সিম্বেল বিমানবন্দরে পৌঁছান।
দর্শনার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং মন্দিরে সুশৃঙ্খল প্রবেশ ও প্রস্থান নিশ্চিত করতে প্রাদেশিক প্রশাসন, নিরাপত্তা বিভাগ, পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে। মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয় বড় পর্দা, যাতে দর্শনার্থীরা উপাসনাকক্ষের ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশের বিরল দৃশ্য অনুসরণ করতে পারেন।
মিশরে পাসপোর্ট আটকে রেখে ২২০ বাংলাদেশি শ্রমিককে কাজে বাধ্য করানোর অভিযোগ
ছয় দিনের লোকজ উৎসবে মিশরের সংস্কৃতির উদ্যাপন
সূর্য উৎসবকে কেন্দ্র করে ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আবু সিম্বেলে আয়োজন করা হয় ছয় দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব। মিশরের জেনারেল অথরিটি ফর কালচারাল প্যালেসেসের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে অংশ নেয় দেশটির ছয়টি লোকশিল্পী দল। তাদের সংগীত, নৃত্য ও লোকজ পরিবেশনায় তুলে ধরা হয় মিশরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
সূর্যালোকের এই বিশেষ ঘটনাকে ঘিরে নির্ধারিত দিনগুলোতে বিদেশি প্রাপ্তবয়স্ক পর্যটকদের প্রবেশমূল্য ছিল ১ হাজার ২০০ মিশরীয় পাউন্ড এবং মিশরীয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৬০ পাউন্ড।
প্রাচীন পাথরের দেয়াল পেরিয়ে হাজার বছরের পুরোনো ফারাওয়ের মুখমণ্ডলে সূর্যের সোনালি আলো পড়ার দৃশ্য যেন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক প্রতীকী সেতুবন্ধন তৈরি করে। আবু সিম্বেল মন্দির তাই কেবল প্রাচীন রাজকীয় স্থাপত্যের নিদর্শন নয়; এটি মানবসভ্যতার সৃজনশীলতা, জ্ঞান, প্রকৌশল দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমর প্রতীক।