আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ছেন বেন স্টোকস

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ছেন বেন স্টোকস
বেন স্টোকস। ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ড ক্রিকেটের আধুনিক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী চরিত্রগুলোর একজন বেন স্টোকস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টই হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ।

Advertisement

রোববার চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর আগে সতীর্থদের নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ৩৫ বছর বয়সী স্টোকস। পরে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড জানায়, চলতি টেস্ট শেষেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নেবেন ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর ব্যাট, বল ও নেতৃত্বে ইংল্যান্ডকে বহু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন তিনি। ২০২২ সাল থেকে ছিলেন ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক।

ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে স্টোকসের জায়গা আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। বড় ম্যাচে, বড় চাপে নিজেকে আলাদা করে তোলাই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ৮৪ রান ইংল্যান্ডকে প্রথম ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ের পথে রাখে। সেই ম্যাচের নাটকীয়তা, সুপার ওভার এবং স্টোকসের লড়াই ইংলিশ ক্রিকেটের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে।

একই বছর অ্যাশেজে হেডিংলির অপরাজিত ১৩৫ রানের ইনিংসও ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় টেস্ট ইনিংস হিসেবে বিবেচিত। প্রায় অসম্ভব পরিস্থিতি থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডকে এক উইকেটের জয় এনে দিয়েছিলেন স্টোকস। ২০১৬ সালে কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২৫৮ রান তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ স্কোর।

স্টোকসের বিদায়ের ঘোষণা এসেছে ইংল্যান্ডের জন্য অস্বস্তিকর এক সময়ের পর। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের পর লন্ডনের একটি নাইটক্লাব-ঘটনার সূত্রে স্টোকস ও গাস অ্যাটকিনসন আলোচনায় আসেন। দলীয় কারফিউ ও আচরণবিধি ভাঙার কারণে দুজনকে লিখিত সতর্কতা দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় টেস্টে তাঁরা খেলেননি। তবে সহিংস ঘটনার জন্য তাঁদের দায়ী করা হয়নি। ইসিবি জানায়, স্টোকস ওই সহিংস ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না এবং অ্যাটকিনসন অপ্ররোচিত আক্রমণের শিকার হলেও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাননি।

তৃতীয় টেস্টের আগে দলে ফিরে সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চান স্টোকস। তবে রোববার তাঁর বার্তাটি ছিল ভিন্ন। সতীর্থদের তিনি জানান, ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও ক্রিকেটার হিসেবে এটিই তাঁর শেষ সময়। কারণ পরে ব্যাখ্যা করা যাবে, আপাতত দলের জন্য শেষবার সবটুকু দিয়ে যেতে চান তিনি।

ঘোষণার পর ট্রেন্ট ব্রিজের দর্শকদের কাছ থেকেও দাঁড়িয়ে অভিবাদন পান স্টোকস। মাঠেই ছিলেন তিনি। খবরটি প্রকাশের পর প্রথম বলেই উইকেট নেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। বিদায়ের ঘোষণা ও মাঠের লড়াই যেন একসঙ্গে মিশে যায় সেই মুহূর্তে।

অধিনায়ক হিসেবে স্টোকস ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। ব্রেন্ডন ম্যাককালামের সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বজুটি আক্রমণাত্মক, ইতিবাচক এবং ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এক ইংল্যান্ড দল তৈরি করে। ক্রিকেট দুনিয়ায় যা পরিচিত হয়ে ওঠে বাজবল নামে। ২০২২ সালে ভারতের বিপক্ষে ৩৭৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় এবং নিউজিল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে হারানো সেই সময়ের বড় সাফল্যের মধ্যে ছিল।

ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে বিতর্ক থাকলেও স্টোকসের ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার অনেক বড়। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, হেডিংলির অলৌকিক ইনিংস, কেপটাউনের ২৫৮, আর টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে ইংল্যান্ডের খেলার ধরন পাল্টে দেওয়া, সব মিলিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ।

ইসিবি চেয়ারম্যান রিচার্ড থম্পসন স্টোকসকে ইংল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য ব্যাটসম্যান, বোলার, অধিনায়ক ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চাপের মুহূর্তে অবিশ্বাস্য কিছু করার ক্ষমতা, লড়াকু মানসিকতা এবং নেতৃত্বের জন্যই স্টোকসকে আলাদা করে দেখছে ইংলিশ ক্রিকেট।

এই সিরিজেই নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবার স্টোকসও বিদায় নিচ্ছেন। ফলে ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড সিরিজটি হয়ে থাকছে দুই আধুনিক গ্রেটের বিদায়ের সিরিজ হিসেবেও।

স্টোকসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হচ্ছে ট্রেন্ট ব্রিজে। কিন্তু ইংল্যান্ড ক্রিকেটে তাঁর প্রভাব শেষ হবে না এত সহজে। ব্যাট হাতে অসম্ভবকে সম্ভব করা, বল হাতে চাপ তৈরি করা, আর অধিনায়ক হিসেবে দলকে ভয়ডরহীন ক্রিকেটে বিশ্বাস করানো, বেন স্টোকসের গল্প ইংল্যান্ড ক্রিকেটে বহুদিনই ফিরে আসবে।