
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত আশা ইউনিভার্সিটির চার জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইজন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এবং দুইজন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। এ ঘটনায় সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোছা. জিনাত তারাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করেন মোছা. জিনাত তারা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের বকেয়া বেতন-ভাতা, বোনাসও আটকে রেখেছেন তিনি।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটিতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন জিনাত তারা। তার যোগদানের পর চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। তাদের মধ্যে একজন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। বাকি তিনজন সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার।

এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, করোনা মহামারির পর থেকে জিনাত তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানে বাধা দিয়ে আসছিলেন। ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে কাজ করা এই কর্মকর্তাদের মাত্র এক দিনের নোটিশে কম্পিউটার দক্ষতাবিষয়ক পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এরপর ফোনে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা হয়, নিজ থেকে চাকরি না ছাড়লে ছাঁটাই করা হবে, যা তাদের জন্য সম্মানজনক হবে না।
ভুক্তভোগীদের বকেয়া বেতন-ভাতা ও বোনাসের অর্থ পরিশোধেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন জিনাত তারা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সেই বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী, জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করানোর ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য।
ভিত্তিহীন অভিযোগে শোকজ
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল রেকর্ডে কোনো পূর্ববর্তী অভিযোগ না থাকলেও জিনাত তারা দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের শোকজ করেন।
অভিযোগের মধ্যে ছিল অফিসে দেরিতে আসা, অতিরিক্ত ছুটি ভোগ, অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা, কর্তব্যে নিষ্ঠার অভাব, বাংলা টাইপিং না পারা, ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা, অসদাচরণ, নিয়মনীতি না মানা ও কাজে অনীহা।
নারীদের দিয়ে পুরুষদের ওয়াশরুম তদারকি
একাধিক ভুক্তভোগী এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন, জিনাত তারা ডাবল মাস্টার্সধারী জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাদের পুরুষদের ওয়াশরুম নিয়মিত মনিটরিং করার নির্দেশ দিতেন। কোন নারী কর্মকর্তা কতক্ষণ ওয়াশরুমে থাকেন, সেটিও স্টাফদের দিয়ে নজরদারি করাতেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ১৫ এপ্রিল এক চিঠিতে জিনাত তারাকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাকে আগের পদ জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার হিসেবে বহালের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে অবিলম্বে একজন পূর্ণকালীন রেজিস্ট্রার নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে জিনাত তারা চলতি বছরের ২০ জুন পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন।
কর্মস্থলে নানা ধরনের হয়রানির ঘটনায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে জিনাত তারার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় জিডি করেন একজন সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। পরে সেটি তুলে নিতে নানা জায়গা থেকে তাকে ফোন করা হয়।
আশা ইউনিভার্সিটির একাধিক কর্মীও তাকে জিডি তুলে নিতে বলেন। এর অন্যথা হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। ভুক্তভোগী ওই নারীর দাবি, উপাচার্যের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাকে দিনের পর দিন এভাবে হয়রানি করা হয়।
কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানির কথা তুলে ধরে গত মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) চেয়ারম্যান রাবেয়া আখতারের কাছে শরণাপন্ন হন তিন নারী কর্মকর্তা। বিষয়টির প্রতিকারের জন্য তার কাছে লিখিত আবেদন জানান তারা। তবে বিওটি চেয়ারম্যানের তরফে কোনো সাড়া মেলেনি।
প্রশাসনিক অনিয়ম
নথিপত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার দায়ে ইতোপূর্বে একাধিকবার শোকজ ও সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন জিনাত তারা। তার বিরুদ্ধে অযোগ্য শিক্ষার্থীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হয়েছিল।
ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর আশরাফুল হক চৌধুরী তানভীর। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মুখে গত ১৫ এপ্রিল এক চিঠিতে তানভীরকে অপসারণের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই তানভীরের সঙ্গে যোগসাজশে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন জিনাত তারা।
চলতি মাসে আশরাফুল হক চৌধুরী তানভীরকে অপসারণের কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণের কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব জিনাত তারা। ওই কমিটিতে আশা এনজিও থেকে দুইজন এবং আশা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজন ছাড়া বাইরের কোনো সদস্য রাখা হয়নি। তবে নারীদের হেনস্তার অভিযোগের মুখেও জিনাত তারাকে ওই পদে বহাল রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
যা বললেন সংশ্লিষ্টরা
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে মোছা. জিনাত তারার সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। ফোনে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম রেজাউল করীমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।






