অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন, এই ভুলগুলো করবেন না

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন, এই ভুলগুলো করবেন না
ছবি : সংগৃহীত

নারীদের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শরীরে একের পর এক পরিবর্তন আসতে থাকে। হরমোনের ওঠানামা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং গর্ভের শিশুর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার কারণে এই সময় নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলেও অনেক সময় অবহেলিত একটি সমস্যা হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী নিয়মিত মলত্যাগ করতে না পারা, শক্ত মল, পেট ফাঁপা বা মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার মতো সমস্যায় ভোগেন। এতে শুধু অস্বস্তিই নয়, দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হতে পারে।

Advertisement

ভালো খবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা গুরুতর নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হালকা শারীরিক নড়াচড়া এবং কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে, সেটিও জানা জরুরি। তাই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কেন কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া কতটা নিরাপদ এবং এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার কার্যকর উপায়গুলো জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

কেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য হয়

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শরীরে প্রোজেস্টেরন নামের একটি হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন অন্ত্রের চলাচল কিছুটা ধীর করে দেয়। ফলে খাবার অন্ত্রে বেশি সময় থাকে এবং শরীর সেখান থেকে বেশি পানি শোষণ করে নেয়। এর ফলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে-

  • আয়রন ট্যাবলেট বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া
  • শারীরিক চলাফেরা কমে যাওয়া
  • পর্যাপ্ত পানি না পান করা
  • আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া
  • গর্ভের শিশুর আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া

এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়।

  • সপ্তাহে তিনবারের কম মলত্যাগ হওয়া
  • মল শক্ত বা শুকনো হয়ে যাওয়া
  • মলত্যাগের সময় অনেক চাপ দিতে হওয়া
  • পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি বলে মনে হওয়া
  • পেট ফাঁপা বা ভারী লাগা
  • পেটে অস্বস্তি বা হালকা ব্যথা

মলত্যাগের সময় বেশি জোর দেওয়া কি নিরাপদ?

অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী মনে করেন, একটু বেশি চাপ দিলেই মল বের হয়ে যাবে। কিন্তু নিয়মিত বা অতিরিক্ত জোর দেওয়া ঠিক নয়।

অতিরিক্ত চাপ দিলে অর্শ বা পাইলস, পায়ুপথে ফাটল এবং ব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে জোর করার পরিবর্তে মল নরম করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

অনেকেই ভয় পান, মলত্যাগের সময় চাপ দিলে গর্ভের শিশুর ক্ষতি হবে। সাধারণভাবে স্বাভাবিক কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মলত্যাগের সময় যে চাপ দেওয়া হয়, তা শিশুর ক্ষতি করে না। কারণ গর্ভের শিশু জরায়ুর ভেতরে অ্যামনিওটিক তরলের সুরক্ষায় থাকে। তবে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বা দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে কী করবেন?

আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। যেমন - পালং শাক ও লাল শাকসহ বিভিন্ন শাক, পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি, কমলা, ওটস, লাল চাল, আটার রুটি, ডাল, ছোলা এবং বিভিন্ন ধরনের শিম ও মটরশুঁটি।

আঁশ মলকে নরম রাখতে সাহায্য করে এবং সহজে বের হতে সহায়তা করে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

শুধু আঁশ খেলেই হবে না, পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করলে মল নরম থাকে এবং অন্ত্রের কাজ স্বাভাবিক থাকে। পানি ছাড়াও ডাবের পানি, স্যুপ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর তরল খাবার খেতে পারেন।

নিয়মিত হাঁটুন

চিকিৎসক নিষেধ না করলে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হালকা হাঁটার চেষ্টা করুন। নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া অন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখতে সাহায্য করে।

বেগ চেপে রাখবেন না

মলত্যাগের বেগ অনুভব করলে যত দ্রুত সম্ভব টয়লেটে যান। অনেকক্ষণ বেগ চেপে রাখলে মল আরও শক্ত হয়ে যেতে পারে।

নির্দিষ্ট সময়ে টয়লেটে যাওয়ার অভ্যাস করুন

প্রতিদিন একই সময়ে টয়লেটে যাওয়ার অভ্যাস করলে অন্ত্রও ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সকালের নাশতার পর অনেকের জন্য এটি উপকারী হতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কি ওষুধ খাওয়া যাবে?

খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার পরও যদি সমস্যা না কমে, তাহলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ফাইবার সাপ্লিমেন্ট, স্টুল সফটেনার বা নিরাপদ ল্যাক্সেটিভের পরামর্শ দিতে পারেন।

তবে নিজের ইচ্ছামতো কোনো কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ, হারবাল ওষুধ বা ভেষজ উপাদান ব্যবহার করা উচিত নয়। কিছু ওষুধ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

  • কয়েক দিন ধরে একেবারেই মলত্যাগ না হওয়া
  • তীব্র পেটব্যথা
  • মলে রক্ত দেখা
  • বমি হওয়া
  • জ্বরের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া
  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরও সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা
  • তীব্র ব্যথার কারণে স্বাভাবিক কাজ করতে না পারা

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি গুরুতর নয় এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সমস্যার মূল কারণ দূর করার চেষ্টা করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। আর সমস্যা যদি দীর্ঘদিন থাকে বা অন্য কোনো জটিল লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এতে মা ও গর্ভের শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সূত্র: ভিকমেক, ডালকোল্যাক্স