ঘুমানোর আগে কলা খেলে কি সত্যিই ভালো ঘুম হয়

অনেকেই রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। কেউ দীর্ঘক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকেও ঘুমের দেখা পান না, আবার কারও মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রাকৃতিক উপায়ে ভালো ঘুমের উপায় খোঁজেন। সেই তালিকায় কলার নামও বেশ পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলা এমন কিছু পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ, যা শরীরকে শিথিল হতে সাহায্য করতে পারে এবং ভালো ঘুমের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু কলা খেলেই যে অনিদ্রার সমস্যা দূর হবে, এমনটি নয়। স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঘুমানোর আগে কলা খেলে কী কী উপকার হতে পারে।
ট্রিপটোফ্যান ঘুমের হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে
কলায় ট্রিপটোফ্যান নামে একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। শরীরে এই উপাদান থেকে তৈরি হয় সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন। সেরোটোনিন মনকে শান্ত রাখতে এবং শরীরকে আরাম দিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে মেলাটোনিন আমাদের ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের মাধ্যমে পাওয়া ট্রিপটোফ্যান দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে এবং ভালো ঘুমে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে মাঝারি পাকা হলুদ রঙের কলায় ট্রিপটোফ্যানের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে।
ম্যাগনেসিয়াম পেশি শিথিল রাখতে সাহায্য করে
কলা ম্যাগনেসিয়ামেরও একটি ভালো উৎস। এই খনিজ উপাদান পেশি ও স্নায়ুকে শিথিল হতে সাহায্য করে। যাদের শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি থাকে, তাদের অনেক সময় ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই রাতে কলা খেলে শরীর কিছুটা আরাম অনুভব করতে পারে।
পটাশিয়াম রাতে পায়ের টান কমাতে পারে
কলায় প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইটগুলোর একটি। রাতে অনেকের পায়ে টান বা ক্র্যাম্প ধরে। পর্যাপ্ত পটাশিয়াম পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং এমন সমস্যা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে ঘুমও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
কার্বোহাইড্রেট ট্রিপটোফ্যানের কাজ সহজ করে
একটি মাঝারি আকারের কলায় প্রায় ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে। ঘুমানোর আগে পরিমিত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে ট্রিপটোফ্যান সহজে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে। ফলে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরির প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে।
ক্ষুধার কারণে ঘুম ভাঙার আশঙ্কা কমে
কলায় থাকা খাদ্যআঁশ দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। যারা মাঝরাতে ক্ষুধার কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে হালকা নাশতা হিসেবে একটি কলা উপকারী হতে পারে।
একটি মাঝারি কলায় প্রায় ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। তবে কাঁচা বা কম পাকা কলায় আঁশের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে।
ভিটামিন বি৬ ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
কলায় ভিটামিন বি৬ রয়েছে, যা শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই কারণে নিয়মিত সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে কলা খাওয়া ভালো ঘুমে সহায়ক হতে পারে।
কখন খাওয়া সবচেয়ে ভালো?
ঘুমানোর ঠিক আগে কলা খাওয়ার চেয়ে ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে খেলে বেশি উপকার পাওয়া যেতে পারে। এতে শরীর কলার পুষ্টি উপাদান হজম ও ব্যবহার করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়।
মনে রাখবেন, ভালো ঘুমের জন্য কলা উপকারী হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়। ভালো ঘুমের জন্য কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসও জরুরি। যেমন-
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- ঘুমানোর আগে মোবাইল, ট্যাব বা টিভির ব্যবহার কমান।
- শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখুন।
- বিকেল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমাতে সমস্যা হয়, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায় বা পর্যাপ্ত ঘুমের পরও সারাদিন ক্লান্ত লাগে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি, বিষণ্নতা এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঘুমানোর আগে একটি কলা খাওয়া কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ভালো ঘুমে সহায়ক হতে পারে। এর ট্রিপটোফ্যান, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ ও খাদ্যআঁশ শরীরকে শিথিল রাখতে এবং ঘুমের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে অনিদ্রার স্থায়ী সমাধান হিসেবে শুধু কলার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও ভালো ঘুমের অভ্যাসই সুস্থ ঘুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সূত্র: ভেরি ওয়েল হেল্থ







